অজয়ের চড়ে আশ্রমের প্রতিষ্ঠা করে, গান বাঁধতে শুরু করেন দাস রাধাময়!

0
39

রাধামাধব মণ্ডল

“কে জানতো জয়দেবের মিলাতে গো মিলাতে / তোমার সঙ্গে দেখা হবে পোষের সাঁজ বিলাতে।। /দিখা হলো ভালোই হলো / কুন আখড়ায় উঠেছো/ উখান থেকে সঙ্গে করে / কাউকে কি এনেছো।/ কেউ যদি না থাকে চল/ কাঙালের বটতলাতে।।”

Das Radhamay | newsfront.co
দাস রাধাময়। ছবিঃ লেখক

মরা অজয়ের বিস্তীর্ণ চড়! শুনশান নীরবতার অন্ধকার রাতে, তিনি গাবগুবি বাজিয়ে আশ্রমে বসেই গাইছেন নিজের পদ। পাশে বসে শুনছেন, এক সুবর্ণ কঙ্কণ পড়া অপূর্ব সুন্দর নারী! ভাঙ্গা এক কুঁচি চাঁদের লুকোচুরি চলছিল কৃষ্ণকালো আকাশের ঝুঁটিতে! দূরের নদী গহ্বর থেকে, শ্মশান ভূমির দিক থেকে ভেসে আসছে মাতাল শৃগাল দলের সমবেত আর্তনাদ। জ্বলন্ত উনুনের চোখের কিনারে চলকে ভেসে আসছে আলো! টিমটিম করে আশ্রমের আঙ্গিনায় জ্বলছে কেরোসিন কুপি! বসে তন্ময় গাইছেন সাধক! তিনি দাস রাধাময়।

Radhabinod Temple | newsfront.co
জয়দেবের রাধাবিনোদ মন্দির। ছবিঃ লেখক

রাধাময় গোস্বামী তাঁর জন্ম ১৯৩০ খৃষ্টাব্দের ২০ মে। বর্ধমানের খাসপুরের রশীদ ডাক্তারের ছেলে কাজী নুরুল ইসলামকে ছাত্রাবস্থায় অনেকেই দেখেছেন বীরভূমের খুজুটিপাড়া, বর্ধমানের মঙ্গলকোট এলাকাতে ঘুরে বেড়াতে। বর্ধমানের মঙ্গলকোটে পড়াশোনার সময় অজয়ের কোলে কোগ্রামের লোচন দাসের সমাধি ভূমিতে দাঁড়িয়ে কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় হয়। এর বেশকিছু কাল পরে তিনি বর্ধমান শহরের গিয়ে শুরু করেন বসবাস। সেখানেই তিনি সুভাষপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

রাজনীতির ঘোলা জলে বেশি দিন টিকাতে পারেননি তিনি নিজেকে। পুনরায় আবার সেই নিজের জানা চেনার গ্রাম খুজুটিপাড়াতে ফিরে আসেন। ঠিক সে সময়েই খুজুটিপাড়া সরকারি হাসপাতালের সেবিকা আশালতা দেবীর সঙ্গে প্রথম আলাপেই তাঁর প্রেমে পরেন। আশালতা দেবী বীরভূমের কুণ্ডলা গ্রামের তারকনাথ মুখোপাধ্যায়ের কন্যা। আর তাঁর প্রথম বিয়ে হয়েছিল সিউড়ির ধ্বজাধারী চট্টরাজের সঙ্গে। ১৮ বছর বয়সে বৈধব্য আর তার ঠিক কিছু দিনের মধ্যেই পিতৃ বিয়োগ ঘটে তাঁর। জীবনের সেই সঙ্কট কালে, আশালতা মুখোপাধ্যায় কাজী নুরুল ইসলামের সঙ্গলাভ করেন। জীবনে শান্তির জন্য চলে আসেন প্রেমের পথে।

“মন্দ ভালো দুটিই সমান সংসারে। /কেউ ছোট নয় কেউ বড় নয়/ একটু দেখ খোঁজ নিয়ে। ” ঠিক সেই সময়েই কাজী নুরুল ইসলাম সংসারের সমস্ত বন্ধন কাটিয়ে মুর্শিদাবাদের রাধারঘাট আশ্রমের নিতাই খেপার কাছে গিয়ে বৈষ্ণব মতে দীক্ষা ও তাঁর থেকেই সন্ন্যাস নেন। সেই নবীন সন্ন্যাসীর জন্মনাম ছেড়ে সাধনার পথে নতুন নাম হয় রাধাময় গোস্বামী।

“ও পরাণের কালো পাখি/ ভিজে ছোলায় ভোলে না/ সোনার খাঁচা গড়ে তুমি/ ধরা পেলে না!!”

এরপরই তিনি ধর্মসঙ্গিনী আশালতা দেবীকে সঙ্গে নিয়ে চলে আসেন বীরভূমের অজয় নদের তীরবর্তী জয়দেব কেন্দুলীর সেদিনের নির্জন গ্রামে। সেখানে শ্রীশ্রী হরিদাস আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে, গৃহী বৈষ্ণব সাধকের জীবন অতিবাহিত করতে শুরু করেন। মনের আনন্দে বাঁধেন গান।

ঠাকুর হরিদাসের মূর্তির সামনে বসে সে গান গাইতেন, লম্বা দীর্ঘদেহি ফর্সা কপালের মানুষ। কাঁচা চুরের বৈরী ঝুটি মাথার উপরে আর মুখে কাঁচা পাকা মানানসই দাড়ি। মুখ ভর্তি দাঁতে, গালভরা হাসি। অন্যরকম ব্যক্তিত্বের চেহারার মাঝবয়েসী মানুষটি, এই জয়দেবের মাটিতেই প্রথম শুরু করেন “চণ্ডীদাস পত্রিকা”।

” বেনারসি ছিড়ে গেল হাঁসা পাথরে /পিরীতির বেদনা আমার গায়ে গতরে।।/লাগবে জোড়া ছেঁড়া কাপড় / উঠবে সেরে ভাঙা গতর/ তাই পিরীতের হাঁসা পাথর/ লুকিয়ে রাখি পাঁজরে।।”

আশ্রম প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পরে তিনি কেন্দুলীর উন্নয়নের জন্য, স্থানীয় মানুষদের নিয়ে শুরু করেন “জয়দেব অনুসন্ধান সমিতি”। সে সময় এ-কাজে তাঁকে কেন্দুলীর শ্রীশ্রী নিম্বার্ক আখড়ার মহান্ত মহারাজ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। এদিকে উড়িষ্যার পণ্ডিতেরা সে সময় কবি জয়দেবকে, তাঁদের উড়িষ্যার মানুষ বলে নানা দাবি তুলেছেন। তাঁরা বলেছেন, উড়িষ্যার কেন্দুলা নামের একটি গ্রামে তাঁর জন্মভূমি।

সেখানেই নাকি তাঁর গীতগোবিন্দম্ এর রচনা! এই ঘটনায় কাজী নুরুল ইসলাম জয়দেব কেন্দুলীতে ও বীরভূমের সিউড়িতে রাজ্যের বিভিন্ন পণ্ডিতদের ডেকে এনে প্রতিবাদ সভা করেছিলেন। তাঁর জীবন দশায় তিনি লড়াই করে, মহান্ত আখড়ার শ্রী হরিকান্ত শরণ দেব ব্রজবাসীর দেওয়া ” জয়দেব অনুসন্ধান সমিতি”র রেজিস্ট্রারকৃত জায়গায় বর্তমানে সংগ্রহশালা, বাউলমঞ্চ ও গ্রন্থাগার নির্মিত হয়েছে। তাঁর একটি গানে তিনি বলছেন….

“যারে যা বোষ্টমী যা ঘর থেকে /আমি ভাত রেঁধে খাব কাল থেকে। / আমি মাধুকরী করব নিজে/চোখের জলে ভিজে ভিজে/ আবার পান্তা ভাতে ঘি খাব রে/ গায়ে গরম ত্যাল মেখে।।/ যা রে যা বোষ্টমী যা ঘর থেকে। ”

কাজী নুরুল ইসলাম মানতেন “গৌরাঙ্গ দর্শনই মানুষকে মানুষ করার ও মুক্তির একমাত্র পথ”।

এই বিশ্বাসকে সামনে রেখে তিনি ” আন্তর্জাতিক শ্রী চৈতন্য দর্শন প্রচার সমিতি” তৈরি করেন। জেলা থেকে জেলান্তরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দর্শনের প্রচারের ব্যবস্থা করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি “অখিল ভারতীয় ভাষা সাহিত্য সম্মেলনে” জাতীয় সংহতির উপর বক্তব্য রাখার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন।

“পিড়ীতি হয় না জানি/ জাতে বেজাতে/ খিচুড়ি হয় মিশে গেলে/ ডালে আর ভাতে।।”

তিনি তাঁর জয়দেবের আশ্রমে বসেই তিন শতাধিক জনপ্রিয় গান লিখেছেন। তাঁর বহু বাউলগান, আজ জনপ্রিয়। বহু পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত শিল্পী তাঁর লেখা গান গুলি গেয়েছেন। নাম করেছেন। অনেকেই নিজের নামেও চালাচ্ছেন। ২৯৮৯ র ১০ আগস্ট তিনি কেন্দুলীর মাটিতে লোকান্তরিত হন। আশ্রমে রয়েছে তাঁর একমাত্র পুত্র সত্যকাম।

“ঝিঙেফুলি সাঁঝেতে/পেয়ে পথের মাঝেতে/ কাদা দিলি তু কেনে কাদা দিলি সাদা কাপড়ে। /”

তাঁর একটি বিখ্যাত গান আজ অনেকেই নিজের নামে চালাচ্ছেন। যদিও গানটি প্রথম বীরভূম জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের হেনা মুখার্জি “কিরণ কোং” ক্যাসেট কোম্পানি থেকে রেকর্ড করেন, সেই সত্তরের দশকে। পরবর্তী কালে গানটি বেতারে গান জয়দেবের শিল্পী শান্তি রজক, সেটাও সত্তরের দশকের শেষ দিকে হবে।
লালমাটি আর বাউলদের দেশ বীরভূম। সেখানেও আপ্তবাক্যের সাধনা ছেড়ে বাবু বাউলদের নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়েছে। কেউ সাধন পথের পথিক নয়, কেবল গান গায়। এরা যেন বাউল গানের গায়ক। সেই পরিবর্তন ধরতে গিয়েই দাস রাধাময় লিখেছেন

“দ্যাশ ভরেছে বাবু বাউলে/ তারা জামা জোড়া পরছে এখন/ ভোর কোপীন খুলে ফেলে।”

কিংবা অসম্ভব জনপ্রিয় একটি লোক গানে, এই বৈষ্ণব কবি তুলে আনছেন সাংসারিক কুট কাচালি। স্বামী স্ত্রীর নানান সাংসারিক ঘটনায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে এই লোক গানটি। সেদিনের বিভিন্ন শিল্পীরা তাঁর এই গানটি গেয়েছেন। চালিয়েছেন নিজের নামেও!

“ঠাটের কথায় হেসে বাঁচি না/ পাটের শাক লাটের বিটির মুখে উঠে না।।”

জীবন নদীর চড়ে, ঘুরে তিনি দেখেছেন যে মরার আগে মরে সে কেবল মরে। জয়দেবে যে আশ্রমকে ঘিরে, সাংস্কৃতিক উদ্মাদনার ঝড় উঠেছিল ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে সেই শ্রীশ্রী ঠাকুর হরিদাস আশ্রমের প্রতিষ্ঠা করে কবি কুমুদকিঙ্কর, তাঁর গানের বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন এলাকার সংস্কৃতি প্রেমীদের। এই আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে তিনি মা আশালতাকে নিয়ে, পাকাপাকি ভাবে এই জয়দেবেই থাকতেন। পরবর্তী কালে উনি, বর্ধমানের কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে, কুমুদ কিঙ্কর নামও নিয়েছিলেন। উনিই দুবরাজপুরে চণ্ডীদাস প্রেস ও জয়দেব থেকে চণ্ডীদাস পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেন। জয়দেব অনুসন্ধান সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন কেন্দুলীতে।

“তু দাঁড়া নদীর মাঝখানে / এক খিলি পান খাব দু’জনে।/ (হায়) তলিয়ে গেলে মিলিয়ে যাবি/ কুযশ হবি ভুবনে।। “

নিউজফ্রন্ট এর ফেসবুক পেজে লাইক দিতে এখানে ক্লিক করুন
WhatsApp এ নিউজ পেতে জয়েন করুন আমাদের WhatsApp গ্রুপে
আপনার মতামত বা নিউজ পাঠান এই নম্বরে : +91-9593666485