অবৈধ নির্মাণে চুরি যাচ্ছে চালতিয়া বিলের স্রোত,নীরব প্রসাশন- শিল্পীসেন

0
795

অবৈধ নির্মাণে চুরি যাচ্ছে চালতিয়া বিলের স্রোত,নীরব প্রসাশন- শিল্পীসেন

শিল্পী সেন( শিক্ষিকা) 

 

চলছে নির্মাণ কাজ ছবি:মাসুদ হোসেন

” এ পৃথিবীর সম্পদ মানুষের প্রয়োজনের পক্ষে যথেষ্ট , মানুষের লোভের পক্ষে নয়।”
বহরমপুরে চালতিয়া শ্রীগুরু পাঠশালা ছাড়িয়েই রয়েছে এক বিশাল বিল – চালতিয়া বিল।এই বিলটিতে শীতকালে প্রচুর পাখি আসে।এখানে মাছ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন বহু মানুষ। একসময় এঁরা মাছচাষের জন্য একাধিকবার পুরস্কৃত হয়েছেন।এই বিল ও তার চারপাশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য চেনানোর জন্য প .ব .বিজ্ঞান মঞ্চ থেকে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে অনেকবার প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ শিবির হয়েছে ।এই মনোরম জলাশয়টিকে ঘিরে একটি সুন্দর প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব -যা অনেক মানুষের রোজগারের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

নির্মাণ কাজে বদ্ধ পানা পুকুর হয়ে উঠছে ছবি:মাসুদ হোসেন

বিলটিকে ঘিরে সমস্ত সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করে একদিক থেকে ভরাট করে নানারকম নির্মাণকাজ চলছে। বিলের বহির্গমন নালাটিও প্রায় বুজিয়ে ফেলা হয়েছে।শহরের বিস্তীর্ণ এলাকার
বর্জ্য এই বিলে ফেলা হয়।কিন্তু বহির্গমন নালাটি দিয়ে জল বেরিয়ে যেতে না পারায় বদ্ধ জল দূষিত হয়ে পড়ছে।
জলাশয়গুলিকে বলা হয়
প্রকৃতির কিডনি বা বৃক্ক। প্রাকৃতিক উপায়েই জলাশয়গুলিতে জলশোধনের কাজ চলে।চালতিয়া বিল ও বিষ্ণুপুর বিল বহরমপুরের জোড়া কিডনির মত।সেই কিডনি দুটিকেই অকেজো করে ফেলার ব্যবস্থা চলছে।
জলাশয়গুলির মধ্য দিয়ে বৃষ্টির জল মাটির নিচে যাওয়ার জন্য ভূগর্ভস্থ জলস্তরে জমা হয়।আমরা এমনিতেই মাটির নিচের জল তুলে ফেলে সেই ভান্ডার নিঃশেষ করে ফেলছি ।জলাশয়গুলি বুজিয়ে ফেললে জলসংকট আসন্ন।বহরমপুরে গরমকালে যে জলের অভাবজনিত সংকট কয়েকবছর ধরেই দেখা দিয়েছে।পুকুর , খাল , বিল , নদী নালা বৃষ্টির জল ধারণ করে রাখে। এগুলি বোজানো হলে বৃষ্টির জল ধরে রাখতে না পারায় অনেক এলাকা জলনিমগ্ন হয়ে পড়ে।বহরমপুরের জলাশয়গুলিকে একে একে বুজিয়ে ফেলায় শহরে বৃষ্টি হলেই জল জমে থাকছে।চালতিয়া বিল ভরাট করা চলতে থাকলে আশপাশের অনেক জায়গা বৃষ্টির সময় জলে ডুবে থাকবে।

এটি পানা পুকুর নয় ছিল চালতিয়া বিল ছবি:মাসুদ হোসেন

প্রথম উদ্যোগ নেয় প .ব .বিজ্ঞান মঞ্চ । তারপর এবছর 5 ই জুন , পরিবেশ দিবসে শহরের শিক্ষক ,অধ্যাপক , সাংবাদিক , চিকিত্সক , শিল্পী , সংস্কৃতিকর্মী সহ বিশিষ্ট মানুষ -যাঁরা এ শহরের বিবেক , তাঁদের স্বাক্ষর সম্বলিত প্রচারপত্র বিলি , চালতিয়া বিলের পাশ দিয়ে পদযাত্রা ও পথসভার মধ্যে দিয়ে এই বিল ও অন্য জলাশয়গুলি ভরাটের বিরুদ্ধে শহরের সমস্ত স্তরের মানুষ এক হন। মত্স্যজীবী সমবায় সমিতি সর্বাত্মক সমর্থন নিয়ে যুক্ত হয় । 18 ই জুন গোরাবাজার বিদ্যালয়ে জলাশয়গুলি ভরাট বন্ধের দাবিতে ও চাল তিয়া বিল সংস্কারের দাবিতে কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয় । বিশিষ্ট মানুষদের বক্তব্যে সমৃদ্ধ হয়ে আন্দোলনের রূপরেখা রচিত হয় ।গড়ে ওঠে ” জলাভূমি রক্ষা কমিটি -মুর্শিদাবাদ জেলা । ” আহবায়িকা হন বহরমপুর মহাকালী পাঠশালা বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধানশিক্ষিকা শ্রীমতী শুক্লা মন্ডল। শহরের বহু স্থানে পথসভা , দাবির পক্ষে সইসংগ্রহ করে 20শে জুলাই মাননীয় জেলাশাসকের কাছে ডেপুটেশন দেওয়া হয় ।জেলাশাসকের প্রতিনিধিরূপে এ ডি এম ডেপুটেশন গ্রহণ করেন । জলাভূমি রক্ষা কমিটির পক্ষ থেকে মাননীয় এস ডি ও, মাননীয়া বি ডি ও’র কাছে ডেপুটেশন দেওয়া হয়েছে।তাঁরা সহৃদয়ভাবে আমাদের কথা শুনেছেন।মাননীয় জেলাপরিষদের সভাধিপতি , সহসভাধিপতির সাথে দেখা করে এ বিষয়ে কথা বলা হয়েছে। একাধিকবার যাওয়া হয়েছে বি এল আর ও, ডি এল আর ও’র কাছে । কয়েকমাস সমস্ত নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল। দুর্গাপূজার ছুটিতে প্রথমে একটি অস্থায়ী কাঠামো নির্মাণ হয়।বি এল আর ও কে জানানো হয়।এরপর একটি পাকাবাড়ি নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। বহরমপুর থানায় আই সি’র কাছে এই নির্মাণের বিষয়ে জানানো হলে তিনি সেদিনই পরিদর্শন করেন এবং জলাভূমি রক্ষা কমিটির পক্ষ থেকে জমা দেওয়া চিঠিটি বি এল আর ও দপ্তরে পাঠিয়ে দেন । জলাভূমি রক্ষা কমিটি ও সরাসরি বি এল আর ও দপ্তরে দেখা করে ।

স্মারকলিপি

প্রশাসনের সর্বস্তর থেকে সহানুভূতির সাথে দাবিগুলি শোনা হলেও কোন কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি । নির্মাণ কাজ পুরোদমে চলছে । বিলের বহির্গমন নালাটি যেমন রুদ্ধ ছিল , তেমনই রয়েছে।জল এতটাই দূষিত যে দু একটা ছাড়া মাছ চাষ করা যায় নি।ছয়মাস জলে ডোবা থাকলে সেই জায়গা ভরাট করা বেআইনী।ভরাট বন্ধের সেই আইনসঙ্গত দাবিটি উপেক্ষিত।বিলের পাশে ” জলাভূমি ভরাট করা বেআইনী” এবং বর্জ দূষিত পদার্থ না ফেলার হোর্ডিং প্রশাসনের পক্ষ থেকে লাগিয়ে দেবার প্রস্তাবও কার্যকর হয়নি ।জলাভূমি রক্ষা কমিটি হাল না ছেড়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ায় বদ্ধপরিকর।এই পরিপ্রেক্ষিতে বহরমপুরের মানুষের কাছে আহ্বান – জলাভূমি রক্ষায় এগিয়ে আসুন।যে পৃথিবী আমরা পূর্বপুরুষের কাছে নিজেরা ভোগ করার জন্য পাইনি , উত্তরপ্রজন্মের কাছে ঋণ হিসেবে পেয়েছি , তাকে যেন পরবর্তী প্রজন্মের বাসযোগ্য করে রেখে যেতে পারি।

ছবি:মাসুদ হোসেন
নিউজফ্রন্ট এর ফেসবুক পেজে লাইক দিতে এখানে ক্লিক করুন
WhatsApp এ নিউজ পেতে জয়েন করুন আমাদের WhatsApp গ্রুপে
আপনার মতামত বা নিউজ পাঠান এই নম্বরে : +91-9593666485