ভ্রমণঃ প্রেমনগরী মাণ্ডু

0
44

নবনীতা দত্তগুপ্ত

প্রেমনগরী, দুর্গনগরী বা আনন্দনগরী– যে নামেই ডাকা হোক না কেন, প্রকৃতি, প্রেম আর ইতিহাসের সহবাস মাণ্ডুতে। মাণ্ডু উপভোগের আদর্শ সময় হল জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি। সুতরাং যাওয়ার মরশুম চলছে এখন। সাবধানতা মেনে সুবিধা বুঝে যাওয়াই যায়। আর না গেলেও জেনে নিন ঐতিহাসিক মাণ্ডুর চালচিত্র৷

tourist place | newsfront.co

মধ্যপ্রদেশের পশ্চিমাংশে মালোয়ার রাজ্যে অবস্থিত মাণ্ডু। মালোয়ার রাজ্যের রাজধানী মাণ্ডব। মাণ্ডব থেকেই জায়গাটির নাম মাণ্ডু। জেলাশহর ধর থেকে জায়গাটির দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটার। জায়গাটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বাজ বাহাদুর, শাহজাহান, জাহাঙ্গির এবং আকবরের নাম। স্থাপত্যকলা এখানকার অন্যতম আকর্ষণ। মসজিদ, দুর্গ, বড় বড় প্রাচীর—মোদ্দাকথা, স্থাপত্যকলার সিংহ ভাগটাই যেহেতু সুলতানি আমলে নির্মিত তাই খিলজিরা এর নাম বদলে রাখেন শাদিয়াবাদ।

mandu | newsfront.co

তবে মাণ্ডু নামটাই প্রচলিত সকলের কাছে। জায়গাটিতে দুর্গের প্রাচুর্য আছে। তাই একে ‘দুর্গনগরী’-ও বলা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথমদিকে নির্মিত হয় মাণ্ডু দুর্গ। প্রথমে এর নাম ছিল ‘মণ্ডপ দুর্গ’। মণ্ডপ থেকে মাণ্ডব তারপর মাণ্ডু। ৪৫ বর্গমাইল জায়গা বেষ্টিত এই দুর্গটিতে রয়েছে ১২ টি প্রবেশদ্বার। অসাধারণ নির্মাণশৈলীর সাক্ষ্যবহনকারী সুন্দর এই দুর্গকে মুসলমান ঐতিহাসিক গুলাম ইয়াজদানি ‘শারাংপুর’ বা ‘আনন্দের শহর’ নামে অভিহিত করেন।

durganagari | newsfront.co

বিন্ধ্য পর্বতমালার শিখরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক দুর্গনগরীর মাণ্ডু দুর্গ ছিল একসময় পৃথিবীর বৃহত্তম দুর্গ।
দুর্গনগরীর আরেক নাম ‘প্রেমনগরী’। ইতিহাস ঘাঁটলে মাণ্ডুর শেষ স্বাধীন সুলতান বাজ বাহাদুর আর রানি রূপমতীর অমোঘ প্রেমের গল্পের হদিশ পাওয়া যায়। রূপমতী ছিলেন রূপে লক্ষ্মী ও গুণে সরস্বতী। বিন্ধ্যের হাওয়ায় আজও ভেসে বেড়ায় তাঁর গানের সুর, যা একসময় রাজপুতদের শেষ স্বাধীন রাজা বাজ বাহাদুরকে মুগ্ধ করে তুলেছিল। রূপমতীর রূপে আর গুণে মুগ্ধ হয়ে বাজ বাহাদুর তাঁকে বিয়ে করে নিয়ে আসেন মাণ্ডুতে। রানি রূপমতীর জন্য তৈরি হয় রূপমতী ‘প্যাভিলিয়ন’ এবং ‘রেওয়া কুণ্ড’।

 

tourist | newsfront.co

রানি ছিলেন দেবী নর্মদার উপাসক। রোজ সকালে দেবী নর্মদাকে প্রাণ ভরে দেখতেন তিনি। বর্ষাকালে নর্মদা মেঘের আড়ালে চলে গেলে মুখ ভার হত রানির। রানির ভার মুখে হাসি ফোটাতে বাজ বাহাদুরের নির্দেশেই ‘রেওয়া কুণ্ড’ খুঁড়ে জুড়ে দেওয়া হয় নর্মদার সঙ্গে। বাজ বাহাদুরের প্রাসাদের সামনে আজও বহাল তবিয়তে রয়েছে সেই কুণ্ড। পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের জায়গা এই রেওয়া কুণ্ড।

আরও পড়ুনঃ ওয়াঘার পথে জালিওয়ানাবাগে কিছুক্ষন

ইন্দোর থেকে ৯৮ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত প্রাচীন ধ্বংসপ্রাপ্ত দুর্গটি গোটা শহরটিকে ঘিরে রেখেছে কোনও এক ভালবাসার মায়াবী আস্তরণে। প্রায় তিন হাজার বছরের পুরনো এই দুর্গের দেওয়ালে কান পাতলে শোনা যায় সেই সব শাসকদের ইতিহাস যারা বিভিন্ন সময়ে এই নগরীর নাম রেখেছিলেম ‘আনন্দনগরী’ কিংবা ‘মাল্বয়া’।
মাণ্ডু দুর্গের প্রধান ফটক ‘দিল্লি দরওয়াজা’। পর্যটকদের কাছে এটি আরেক আকর্ষণীয় জায়গা। ৪৫কিলোমিটার বিস্তৃত দুর্গের দেওয়াল।

তিনদিকে ছড়িয়ে আছে মাণ্ডুর খণ্ডহর- সেন্ট্রাল গ্রুপ, রয়্যাল এনক্লেভ, রেওয়া কুণ্ড। সেন্ট্রাল গ্রুপের প্রধান আকর্ষণ হোসেন শাহের স্মৃতি সৌধ। এর গম্বুজ শ্বেতপাথরে নির্মিত। ঝালরের কাজও চোখ ধাঁধানো। মুগ্ধ করে এখানকার আফগান স্থাপত্যশৈলী। মোঘল সম্রাট শাহজাহানও একসময় এখানকার স্থাপত্যে মজেছিলেন। তাই তাজমহল বানানোর আগে তিনি চার স্থপতিকে মাণ্ডু নগরীতে পাঠিয়েছিলেন ওখানকার রকমসকম দেখে আসার জন্য।

মাণ্ডু দুর্গই মার্বেল পাথরে তৈরি প্রথম সৌধ। এর কাছেই রয়েছে আশরকি মহল আর জামি মসজিদ।সেন্ট্রাল গ্রুপ থেকে খানিকটা এগোলেই রয়্যাল এনক্লেভ। মানজি আর কাপুর তালাওয়ের ঠিক মাঝখানে রয়েছে ‘জাহাজমহল’। রাতে জাহাজমহলে জ্বলত হাজার প্রদীপ। গানবাজনার আসর বসত। গিয়াসুদ্দিন খিলজির জলক্রীড়ার প্রাসাদ ছিল জাহাজমহল। স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়, রাতের জাহাজমহল মায়াবী রূপ ধারণ করত।

আরও পড়ুনঃ থর মরুভূমিতে হঠাৎ বৃষ্টি

জাহাজমহল থেকে খানিকটা এগোলেই বেলে পাথরে নির্মিত হিন্দোলা মহল। খুব মন দিয়ে নজর করলে মনে হবে মহলটি যেন দুলছে। মহলের খিলান প্রশংসার দাবিদার। হিন্দোলামহলের পশ্চিমে রয়েছে ‘চম্পা বাওলি ইঁদারা’। জানা যায়, দুর্গ আক্রমণের খবর পেলে মেয়েরা ঝাঁপ দিত সেই ইঁদারায়। এরপর তাঁরা ডুবসাঁতারে পৌঁছে যেতেন প্রাসাদের পাতালপুরীর নিরাপদ আশ্রয়ে।

রয়েছে ‘আশরকি মহল’। অনেকে আবার এটিকে বলে থাকেন ‘স্বর্ণমুদ্রার মহল’। এটি মূলত মাদ্রাসা। মহম্মদ শাহ্ খিলজি নির্মাণ করেন এই মহল। একটি সাততলা মিনারও গড়ে তোলা হয়েছিল এখানে।

মাণ্ড জুড়ে রয়েছে জুম্মা মসজিদ, লোহানি গুহা, সেবাকুণ্ড, হোসেন শাহ্ টম্ব, বাজ বাহাদুর প্যালেস, রূপমতী প্যাভিলিয়ন। এখানকার আরেক আকর্ষণের জায়গা‘নীলকণ্ঠ মহল’। আকবর তাঁর স্ত্রী যোধাবাঈয়ের জন্য নির্মাণ করিয়েছিলেন এই নীলকণ্ঠ মহল।

আরও পড়ুনঃ দলাই লামার গুম্ফায়

মাণ্ডুর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও কিছু কম নয়। সবুজের সমারোহ নদী, লেক—সব নিয়ে মোহময় এই মাণ্ডু। বর্ষাকালে এর রূপের ছটা ঠিকরে পড়ে। যার প্রেমে মজেছিলেন জাহাঙ্গির এবং নুরজাহান। জাহাঙ্গির সেখানে বানিয়ে ফেলেছিলেন বিশাল এক হাভেলি। ওই হাভেলিই একদিন হয়ে উঠেছিল জাহাঙ্গির আর নুরজাহানের ভালবাসার রাজপ্রাসাদ। মাণ্ডুর আনাচেকানাচে রয়েছে ইতিহাসের হাতছানি। এ ছাড়া আর কী ই বা মিলবে সেখানে? প্রকৃতি, প্রেম আর ইতিহাস এখানে হাত ধরাধরি করে বেঁচে আছে। ঠিক যেন একে অপরের পরিপূরক।

আজও রাতের অন্ধকারে পাহাড়ের কোল থেকে ভেসে আসে আদিবাসীদের গান ও বাঁশির সুর। প্রসঙ্গত, রানি রূপমতীর উত্তরসূরীরা আজও মাণ্ডুতেই বসবাস করেন। মেঘ আর রোদের লুকোচুরিতে মাণ্ডু দুর্গের প্রাচীনত্ব আরও প্রকট হয়ে ওঠে। প্রসঙ্গত, মাণ্ডু আজ বিলুপ্তপ্রায় শহর হলেও মধ্যপ্রদেশ বেড়াতে গেলে মাণ্ডু যান না এমন মানুষের সংখ্যা বিরল। দুর্গের প্রতিটা কোণ ঘুরে দেখতে হলে একটা গোটা দিন ও রাত থাকতেই হবে মাণ্ডুতে।

ছবি সৌজন্যে- কল্লোল সেনগুপ্ত

নিউজফ্রন্ট এর ফেসবুক পেজে লাইক দিতে এখানে ক্লিক করুন
WhatsApp এ নিউজ পেতে জয়েন করুন আমাদের WhatsApp গ্রুপে
আপনার মতামত বা নিউজ পাঠান এই নম্বরে : +91-9593666485