সংগ্রাম চক্রবর্তী

ইয়েমেন-১৪মিলিয়ন মানুষ যেখানে মানুষেরই সৃষ্টি দুর্ভিক্ষে মৃত্যুর অপেক্ষায়,

ইয়েমেন-যেখানে প্রতিদিন ১৫০ শিশু মারা যায় খাবার আর ওষুধের অভাবে, চিকিৎসার অভাবে,

ইয়েমেন যেখানে হাসপাতাল, পানীয় জল পরিশোধন কেন্দ্র, সাধারন মানুষের বসতি, বিবাহ থেকে শোক মিছিল কিছুই বাদ যায় না বোমাবর্ষনের থেকে।

ইয়েমেন নীরবে ঘটে যাওয়া এক জঘন্য হত্যাকান্ড যা নিয়ে দেশদুনিয়ার নীরবতা ধীরোদাত্ত উদাসীন সর্বংসহার পরিচয় দেয় আমাদের. আমেরিকার ছকে দেওয়া উন্নয়নে আমরা সত্যি উন্নত হয়েছি, বিশ্ব নাগরিক হয়ে উঠেছি।

এই লড়াই শুরু টা ব্যাপকভাবে ২০১৫ সাল থেকে হলেও, কাহিনীর গোড়া পত্তন ২০১২ সালে যখন প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ সালের অনুপস্থিতির সুযোগে ভাইস প্রেসিডেন্ট হাদি ক্ষমতা দখল করে।সালেহর বিগত ৪ দশকের একনায়কতন্ত্র ইয়েমেনিদের জীবন অর্থনীতিতে এক গভীর সংকটের জন্ম দিয়েছিল, কিন্তু মনসুর হাদির ৩ বছরের শাসন তার সমাধান করতে পারে নি, আর তা সম্ভবও নয়. ফলত আনসারুল্লা হুথী বিদ্রোহীদের সাহায্যে আবদুল্লা সালেহ ২০১৫ আবার ক্ষমতা দখন করে, বিরোধ টার শুরু এখান থেকেই,হুথীদের বাদ দিয়ে সালেহ একতরফাভাবে যুদ্ধ বিরতি ঘোষনা করে গোপনে সৌদি আর তার রক্ষাকর্তা আমেরিকার সাথে আলোচনা চালাতে থাকে।অচিরেই তার পরিনতি হুথীদের হাতে মৃত্যু।এর পরপরই সৌদি রাজতন্ত্রের কাছে মনসুর হাদী ন্যায্য দাবীদার হয়ে ওঠে ইয়েমেনের শাসন ক্ষমতার, তাই তাকে মসনদে বসাতে, আমেরিকা ও পশ্চিম দুনিয়ার প্রত্যক্ষ মদতে সৌদি আরব, আরব আমীর শাহী, কাতার, সুদান, চাদ, আর ইথিওপিয়ার যৌথ বাহিনীর অভিযান- নতুন সুন্নী খেলাফৎ স্থাপিনের লক্ষ্যে.. আর তার সাথে প্রায় ১০০০০ ভাড়াটে আল কায়েদা যোদ্ধা।এই বাহিনীকে বিমান, বোমা, ও অন্যান যুদ্ধ যন্ত্রাংশ দিয়ে সাহায্য করে চলেছে আমেরিকা ব্রিটেন, জার্মানী, যদিও খাসোগীর হত্যাকান্ডের পর জার্মানী তার সাহায্য প্রত্যাহারের সিধান্ত নিয়েছে. অন্যদিকে কাতারও এই জোট ছেড়ে বেরিয়ে গেছে।
তাই মুলত সৌদি আর তার ভাড়াটে আল কায়েদা বাহিনীই ওখানে আক্রমন পরিচালনা করছে.. ২০১৬ সাল থেকে লড়াই এখোন পর্যন্ত ৬৫০০০ হাজার মানুষ মারা গেলেও আশ্চর্যজনক ভাবে কর্পোরেট গনমাধ্যমে সংখ্যা টা দাড়িয়ে থাকে মাত্র ১০০০০, বাড়েও না কমেও না,সংবাদমাধ্যম আর তার মালিকরা ক্রমাগত মিথ্যা বলে যেতে থাকে ইরানী ফৌজের উপস্থিতি নিয়ে, যেখানে একজনও ইরানী নেই ইয়েমেনের মাটিতে। জীম ম্যাটিস বা পম্পেই নিজেদের অপরাধ আড়াল করার প্রবল বাসনায়, শান্তি চুক্তির আবেদন জানায় দুপক্ষের কাছেই, কিন্তু আমেরিকান ট্যাঙ্কার বিমানগুলো মাঝ আকাশে সৌদি বোমারুগুলোকে তেল জুগিয়ে চলে, ব্রিটেন আর আমেরিকা থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের অস্ত্রের প্রবাহ কখোনই বন্ধ হয় না..
তবু মানুষ সাধারন মানুষ প্রতিরোধ গড়ে, হুডাইথ বন্দর যা কিনা ইয়েমেনের প্রান প্রবাহ, বহি বিশ্বের সাথে যেটুকু যা যোগাযোগ এই বন্দর দিয়েই) দখল করতে বারবার ব্যর্থ সাম্রাজ্যবাদীরা।বিগত দুই বছরের এই বন্দর দখলের লড়াই তেই সৌদি জোট তার ১০০০০ যোদ্ধাকে হারিয়েছে।অতি সম্প্রতী এই বন্দর দখলের উদ্দেশ্যে আক্রমনকারীদের প্রয়াস ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় পি১ নামক মিসাইলে। যা আবদুল্লা সালেহকে এক সময় জুগিয়েছিল আমেরিকা, ফেলে যাওয়া এই বিশাল মিসাইল বহরের সাথে জনগনের উদভাবনী ক্ষমতা মিশে তা সৌদি জোটের কাছে মৃত্যু দূত।প্রতিশোধ চাই তাই বোম্ব বোম্ব বোম্ব.. মনে পড়ে আপনাদের ভিয়েতনাম..

কিন্তু এত ব্যার্থতার পরও সৌদিজোট কেন লড়াই টা চালিয়ে যাছে..? শুধুই কি সুন্নী খেলাফৎ প্রতিষ্ঠা..বিশেষত যেখানে সৌদির ধর্মীয় পরিচয় ওয়াহাবীজম টাই ভুল দর্শন যা সাম্রাজ্যবাদের জারজ সন্তান।(আমাদের আজকের “হিন্দুত্ব”মত)। উত্তর টা হল সৌদি রাজবংশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা।আসল কারন শাসকের রাজনীতি।শোষিত আর শোষকের সম্পর্ক। আভ্যন্তরিন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সৌদি আরব এক অন্তত্য ধর্মীয় গোড়া ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থা যেখানে গনতন্ত্রের,স্বাধীন মতামত আর মানুষের ন্যায্য অধিকারের কোন দাম নেই.ওয়াহাবী মত বা রাজতন্ত্রে পোষিত দালাল দের বাইরে শিয়া,বা অন্য ধর্মের মানুষ, এমনকি সুন্নীদেরও মুলত দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিকের জীবন কাটাতে হয়। আল- নিমিরকে যেদিন প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়, সাথে আরো ৪৭ জনকেও হত্যা করা যারা প্রায় সবাই ছিল কোন কোন আন্দোলনের সাথে যুক্ত এবং এই আন্দোলনের ফর্মও ছিল শান্তিপুর্ন.. তাই শান্তিপূর্ন পথ হেটে অবদমিত মানুষ যখন মৃত্যুদন্ড পায়, সে অচিরেই সশস্ত্র অভ্যুত্থানের দিকে ঝুকবে, সেখানে প্রতিবেশী ইয়েমেনের এই বার্তা সাফল্য নিশ্চিতভাবেই গতি দেবে ব্যাপার টাতে। তাই যেন তেন প্রকারে যেভাবেই হোক এই প্রতিরোধ গুড়িয়ে দিতে হবে।শাসকের শোসনের বিরুধে কথা বলা বিরাট অপরাধ, আর তার বিরুধে রুখে তাকে দেশছাড়া করা ক্ষমাহীন কাজ….
সেই ক্ষমাহীন ভুলের মাসুল চোকাচ্ছে ইয়েমেনবাসী,কিন্তু তারা সৌদি মার্কিন জোটের পুতুল সরকারকে কোনভাবেই মেনে নেবে না.. হামাস হেজবুল্লাহর পথ বেয়ে হুথিদের যাত্রা শুরু।

(নিবন্ধে ব্যবহৃত সমস্ত ছবি The guardian থেকে সংগৃহীত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here