প্রণব মুখোপাধ্যায় ( ১৯৩৫-২০২০)

0
21

জন্ম ১৯৩৫ সালের ১১ই ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মিরিটিতে; যা স্বাধীনতা উত্তর পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলায়, মৃত্যু ৩১ অগাস্ট ২০২০ বাবা শ্রী কামদাকিঙ্কর মুখোপাধ্যায় ছিলেন একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী, মা শ্রীমতী রাজলক্ষ্মী দেবী।

সিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে স্নাতক। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসে স্নাতকোত্তর এবং এলএলবি ডিগ্রি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তারপর কিছুদিন কলকাতা পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফে ডেপুটি একাউন্ট জেনারেলের দফতরে আপার ডিভিশন ক্লার্ক হিসেবে চাকরি , সে চাকরি ছেড়ে যোগ দেন বিদ্যানগর কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে, তারপর কিছুদিনের সাংবাদিকতা ‘দেশের ডাক’ নামে এক পত্রিকায়।

এরপরেই তাঁর যাত্রা শুরু রাজনীতিতে। ১৯৬৯ সালে মেদিনীপুরের একটি উপনির্বাচনে এক নির্দল প্রার্থীর সম্পূর্ণ নির্বাচনী প্রচারের দায়িত্বে ছিলেন সেখান থেকেই নজরে আসেন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর। ১৯৬৯ এর জুলাই মাসে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হলেন; ১৯৭৫, ১৯৮১, ১৯৯৩, ১৯৯৯ প্রতিবার নির্বাচিত হয়েছেন রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে।

আরও পড়ুনঃ সাতদিনের রাষ্ট্রীয় শোক, আগামীকাল বন্ধ রাজ্যের সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান

তারপরে শ্রীমতী গান্ধী কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় নিয়ে আসেন তাঁকে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্টে ইউনিয়ন ডেপুটি মিনিস্টার হিসেবে। ১৯৭৫ -১৯৭৭ বহু বিতর্কিত দীর্ঘ ২১ মাসের রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করেন ইন্দিরা গান্ধী সরকার, তখন প্রণব বাবু ইন্দিরা সরকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। ১৯৭৭ সালে জনতা দল সরকার ক্ষমতায় এসে ‘শাহ কমিশন’ গঠন করেন, কমিশন প্রণব বাবুকে দোষী সাব্যস্ত করে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির ক্ষেত্রে, বলা হয় তিনি অতিরিক্ত সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন, পরে অবশ্য সে অভিযোগের জল আর বেশিদূর গড়ায়নি। ‘শাহ কমিশন’ ভেঙে দেওয়া হয় কারণ কমিশন নিজেই ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে এই অভিযোগে।

১৯৮২-১৯৮৪ ছিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। শ্রী মনমোহন সিং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর নিযুক্ত হলেন, সে চিঠি প্রণব বাবুরই সই করা।

কংগ্রেসে তাঁর ক্ষমতা কমতে শুরু হয় শ্রীমতী গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর। তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হল বাংলায়। প্রকাশ্যে না বললেও অপমানিত প্রণব বাবু বাংলায় তৈরি করলেন রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস। তবে রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস কোনদিনই সাফল্যের মুখ দেখেনি, ইতিমধ্যে নিহত হলেন রাজীব গান্ধী। নিন্দুকেরা বলে সেই সুযোগ হাতছাড়া করেননি প্রণব, রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেসের অবস্থা দেখে ফিরে গেলেন কংগ্রেসে।

আরও পড়ুনঃ  শিক্ষকতা থেকে সাংবাদিকতা- প্রয়াত প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির বর্ণময় জীবন

১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিংহ রাও প্রণব মুখোপাধ্যায়কে জাতীয় প্ল্যানিং কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান নিযুক্ত করলেন। সোনিয়া গান্ধীর রাজনীতিতে যোগদানের পিছনে প্রভুত অবদান প্রণব মুখোপাধ্যায়ের। ১৯৯৮-১৯৯৯ ছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন প্রণব বাবু এবং প্রেসিডেন্ট শ্রীমতী সোনিয়া গাঁধী। এরপর পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হন ২০০০ সালে, সেখান থেকে ইস্তফা দেন ২০১০ সালে, মূলত শারীরিক কারণে।

দীর্ঘ পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে বিতর্ক থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। জঙ্গীপুর থেকে সাংসদ হয়েছিলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বহুসময় ধরে থেকেছেন অভিযোগ আছে সেভাবে বাংলা কিছু পায়নি তাঁর কাছ থেকে যা হয়তো তিনি চাইলেই করতে পারতেন। কখনও অভিযোগ ওঠে গুরুত্ব কমে যাওয়ায় কংগ্রেস ত্যাগ করে নিজের দল তৈরি করলেন কিন্তু সাফল্য না পাওয়ায় আবার ফিরে গেলেন কংগ্রেসে।

আরও পড়ুনঃ প্রয়াত প্রাক্তন রাষ্ট্রপতিকে শ্রদ্ধা সিএবির

ব্যাংক রাষ্ট্রায়ত্তকরন শুরু হয় তাঁর হাত ধরেই, এরকম বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কঠিন হাতে নিয়েছেন তিনি। কিন্তু সেসব বিতর্ক বা অভিযোগ কঠিন গলায় সামাল ও দিয়েছেন। শেষ বিতর্কের শুরু ২০১৮ সালে আরএসএসের আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে তাদের সদর দফতরে যাওয়ায়। আরএসএসের যে প্রশিক্ষন শিবিরের অনুষ্ঠান কোনো আলোচনাতেই আসেনা, প্রণব বাবুর উপস্থিতিতে সেটাই উঠে এসেছিল সব রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সে বিতর্ক ও কিন্তু প্রণব মুখোপাধ্যায় সামলেছেন নিপুণ হাতে।

২০১২ সালে দেশ পেলো প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতিকে। সেই গুরুদায়িত্ব সামলেছেন বিদগ্ধ এই মানুষটি। রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সাংবিধানিক সবক্ষেত্রেই অবাধ সাবলীল যাতায়াত যাঁর, তাঁকে নিয়ে বিতর্ক থাক বা না থাক চিরকালীন এক উদাহরণ হয়ে থেকে যাবেন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে।

নিউজফ্রন্ট এর ফেসবুক পেজে লাইক দিতে এখানে ক্লিক করুন
WhatsApp এ নিউজ পেতে জয়েন করুন আমাদের WhatsApp গ্রুপে
আপনার মতামত বা নিউজ পাঠান এই নম্বরে : +91-9593666485