নিজস্ব সংবাদদাতা, পশ্চিম মেদিনীপুরঃ

নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিল।সেটাই হল কাল তার।প্রথমে প্রশাসনিক হেনস্তা,পরে প্রশাসনের তরফ থেকে ভুরি ভুরি প্রতিশ্রুতি। বছর দেড়েক প্রশাসন তার দায়িত্ব ও প্রতিশ্রুতি পালন করলেও মাঝখানে বেমালুম ভুলে গেলেন সেই প্রতিশ্রুতি। যার জেরে হন্যে হয়ে ঘুরছেন প্রশাসনের দোরে দোরে একটা কাজের আশায়। ঘুরছেন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আশায়। কিন্তু যেন সব আশায় জল ঢেলে দিচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে কোনো সরকারি চাকরি নেই, আর যদিও বা লুকিয়েচুরিয়ে টুকটাক চাকরি হচ্ছে তাতে আর্থিক লেনদেনের কারনে মুখ ফিরিয়ে ঘুরে আসতে হচ্ছে। এমনই দশা পশ্চিম মেদিনীপুরের গোয়ালতোড়ের কেড়ুমারা গ্রামের সৌম্যদীপ মাহাতোর।
সাল টা ছিল ২০১৫। সবে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য পড়াশুনোর পাঠ চুকিয়ে গোয়ালতোড়ের একটি মোটর সাইকেল গ্যারেজে কাজ নেয়। উদ্দ্যেশ্য আর্থিক সংস্থানের পাশাপাশি পরিবারের দায় নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া এবং পরবর্তীকালে সেই রোজগারের টাকা দিয়ে নিজেই একটা মোটর সাইকেল গ্যারেজ খোলা।সেই উদ্দ্যেশ্য নিয়েই ভর্তি হয় আইআইটিতে। গ্যারেজে কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে পড়াশুনো করছিল আইআইটি তে ভালো রেজাল্ট করতে হবে।

কিন্তু বিধি বাম। আই আই টির ফর্ম ফিল আপ করার পর চুড়ান্ত পরীক্ষার আগের দিন একটি কম্পিউটার সেন্টার থেকে পরীক্ষার প্রবেশিকা (এডমিট) আনতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ সৌম্যদীপের। কারন পরীক্ষার এডমিটে তার নিজের ছবির জায়গায় স্থান পেয়েছে একটি কুকুরের ছবি।আর এই খবরটি আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে। এডমিটে পরীক্ষার্থীর ছবির বদলে কুকুরের ছবি কি ভাবে এলো এই নিয়ে চললো টানপোড়েন।প্রশাসন তৎপর হয়ে উঠলেন দোষী পরীক্ষার্থীই। তদন্তে নামলেন বিশেষ দল। আটক করা হল সৌম্যদীপকে।আর মিডিয়াও এটা নিয়ে মুখোরোচক গল্প বানাতে লাগলো। প্রশাসন পড়লো চাপে। অবশেষে যখন দেখা গেল যে সৌম্যদীপের কোনো দোষ নেই তখন তাকে ছেড়ে দেওয়া হল এবং মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে তাকে গোয়ালতোড় কলেজে বাংলা অনার্সে ভর্তি করে দেওয়া হয়। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় কলেজের পড়াশুনোর খরচ সরকার বহন করবে এবং কলেজ শেষ হলে একটি যে কোনো সরকারী চাকির দেওয়া হবে।
শুরু হলো নতুন অধ্যায়।মোটরসাইকেল গ্যারেজের কাজ ছেড়ে বই এর ব্যাগ হাতে তুলে নিল সৌম্যদীপ। চোখে অনেক স্বপ্ন।সরকার পড়াশুনোর খরচ বাবদ প্রতি মাসে সৌম্যদীপের হাতে তিন হাজার টাকা। ফলে পড়াশুনো করার আর কোনো অসুবিধা রইলো না।নোট বন্দীর সময়ে টানা তিন চার মাস টাকা না পেলেও পরে সেই টাকা তৎকালীন পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পুলিশ সুপার ভারতী ঘোষের তৎপরতায় একেবারে সেই টাকা পেয়ে যায়।পরবর্তীতে জেলায় এলেন নতুন পুলিশ সুপার।তারই কোপ পড়লো সৌম্যদীপের সরকারী অনুদানে।বন্ধ করে দেওয়া হলে কলেজ পড়াশুনো করার জন্য মাসিক সরকারী সাহায্য।সৌম্যদীপ তখন কলেজে দ্বিতীয় বর্ষ। ফাঁপরে পড়লেন সৌম্যদীপের বাবা সুদীপ্ত মাহাত।মাত্র বিঘা দেড়েক জমির উপর সংসার চলে।একছেলে একমেয়ে।কিভাবে পড়াশুনোর খরচ জোগাবেন।এদিকে ছেলের ভবিষ্যৎ অন্য দিকে আর্থিক অনটন। তারই মাঝে পাড়ে কোনো রকমে দেড়বছর ছেলের পড়াশুনোর খরচ জোগাড় করে। সরকারী প্রতিশ্রুতি ছিল কলেজ পাশ করার পর যে কোনো একটা সরকারী চাকরি দেওয়া হবে।সেই মতো যোগাযোগ করেন জেলা পুলিশ ও গোয়ালতোড় থানাতে। পুলিশের পক্ষ থেকে সিভিক পুলিশের কাজ দেওয়া হবে সেই মতো ফর্ম ফিল আপ করানো হলেও ওই টুকুই। কাজের কাজ কিছুই হয়নি।ফলে ফের আবার জেলার পুলিশ সুপারের দারস্থ হয় সৌম্যদীপ তার বাবাকে নিয়ে।সেখান থেকে জানানো কে কি বলেছিল তা আমরা বলতে পারবো না।ছুটে যায় নবান্নতেও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্য।কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে না পারলেও নবান্নের কয়েকজন আধিকারিক জানিয়ে দেন ওই কাজ হবে না। ফলে সমস্যায় পড়েছে সৌম্যদীপ।তার বক্তব্য, আমাকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল একটি কাজের জন্য।কিন্তু সেই কাজ এখনো না পাওয়ায় এখন আমি সম্পূর্ণভাবে বেকার হয়ে পড়েছি।সরকারের প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পড়ে পড়াশুনো না করলে এই দিন টা আমাকে দেখতে হতো না।এখন আর কোনো কাজ পাচ্ছি না।আর সৌম্যদীপের বাবা সুদীপ্ত বাবু বলেন,আমি প্রশাসনের দোরে দোরে ঘুরেছি কোথায় সেই প্রতিশ্রুতি পালনের আশ্বাস পাইনি।ফলে ছেলের মনোবল ভেঙ্গে পড়েছে।শুনছি গোয়ালতোড়ে তৃণমূল সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জী আসছেন ১৭ ই ডিসেম্বর।আমি যদি দেখা করবার সুযোগ পাই তাহলে তাঁকে আমার সমস্যার কথা বলবো আশা করি তিনি কিছু একটা সুরাহা করবেন।তাছাড়া আমি এই মর্মে ব্লকের বিডিওর মারফৎ জেলা শাসকের কাছেও আবেদন জানিয়েছি।
আরও পড়ুন: পানীয় জলের জন্য দেড়কিমি দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়
WhatsApp এ নিউজ পেতে জয়েন করুন আমাদের WhatsApp গ্রুপে
আপনার মতামত বা নিউজ পাঠান এই নম্বরে : +91 94745 60584