আইনজীবী-রাজনীতিক অরুন জেটলির চোখধাঁধানো সাফল্যের গ্রাফে মিশে দেশের আছে বেহাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দায়ভারও

0
59

ওয়েবডেস্ক, নিউজফ্রন্টঃ

তিনি ‘ট্রাবলশুটার’, ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’। তিনি কিং মেকার। কিন্তু সরাসরি জনতার ভোটে জিতে সংসদে যাননি কোনও দিন। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে লড়েছিলেন। কিন্তু প্রবল মোদী হাওয়াতেও অমৃতসর কেন্দ্রে হেরে যান। তবে মোদীর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থেকে গিয়েছেন বরাবর।

যেমন বরাবর ছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ীর স্নেহের পাত্র। ছাত্র বয়স থেকেই এক গতিশীল জীবন। কী রাজনীতিতে, কী আইনের পেশায়— সাফল্য তাঁর পিছনে পিছনে ছুটেছে। মৃত্যুও যেন বড্ড তাড়াতাড়ি ছুটে এল তাঁর জীবনে। দীর্ঘ দিন অসুস্থতার সঙ্গে লড়ে, হেরে গেলেন অরুণ জেটলি।

 arun jaitley | newsfront.co
১৯৭৪ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের সভাপতি নির্বাচনে বিজয়ের চিত্র। চিত্রঃ টুইটার

দেশভাগের সময় লাহৌর থেকে অমৃতসরে চলে এসেছিল অরুণ জেটলির পরিবার। ১৯৫২ সালের ২৮ ডিসেম্বর দিল্লিতে জন্ম হয় তাঁর। দিল্লিরই সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলের ছাত্র ছিলেন।

তারপর দিল্লির শ্রী রাম কলেজ অব কমার্স। ১৯৭৭ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পাশ করেন তিনি। এর মধ্যেই অবশ্য রাজনৈতিক মানচিত্রের অনেকটাই তাঁর কাছে সড়গড় হয়ে গিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) নেতা হয়ে ওঠেন অরুণ জেটলি। ১৯৭৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সভাপতিও হন তিনি। পরে এবিভিপি-র সাধারণ সম্পাদকও হন।

 arun jaitley | newsfront.co
পায়ের উপর পা তুলে আলাপী জেটলি। চিত্রঃ টুইটার

পড়াশোনা আর তার পাশাপাশি রাজনীতি, সেই সময়ের প্রবণতা এড়াতে পারেননি অরুণ জেটলি। তখন ইন্দিরার বিরুদ্ধে আন্দোলনের অস্ত্র সাজাচ্ছেন জয়প্রকাশ নারায়ণ। অরুণ জেটলিকে টেনেছিল জয়প্রকাশ নারায়ণের দেশ জোড়া সেই দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন।

১৯৭৫ সালের ২৫ জুন দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছিল তৎকালীন ইন্দিরা গাঁধী সরকার। তার ঠিক আগের দিনের ঘটনা। দিল্লির রামলীলা ময়দানে জয়প্রকাশের বিরাট জনসভায় গিয়েছিলেন অরুণ জেটলি। তখন তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ছাত্র এবং ছাত্র সংসদের সভাপতি।

 arun jaitley | newsfront.co
ট্রাবল শুটার জেটলি। চিত্রঃ টুইটার

সে দিন বাড়ি ফিরেছিলেন বেশ রাতেই। রাত দুটো নাগাদ আচমকা বাড়ির দরজায় হাজির হয় পুলিশ। জেটলির বাবা মহারাজ কিষেণও আইনজীবী ছিলেন। তিনি তখন পুলিশের সঙ্গে তর্ক শুরু করে দেন।

আমিত শাহের শ্রদ্ধা। চিত্র টুইটার

সেই সুযোগ নিয়েই জেটলি বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যান। পরের দিন সকালে গোটা দেশ জানতে পারল- জরুরি অবস্থা জারি হয়েছে। সে-দিনই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন অরুণ জেটলি।

প্রথমে অম্বালা, তারপর তিহাড় জেল- ১৯ মাস জেলে কাটাতে হয়। আর সেখানেই তাঁর রাজনৈতিক পথের দিশারি হয়ে ওঠেন অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আডবাণী, নানাজি দেশমুখরা।

 arun jaitley | newsfront.co
রাজনাথ সিংহের শ্রদ্ধা নিবেদন। চিত্রঃ টুইটার

রাজনীতিতে অরুণ জেটলির উত্থান খুব দ্রুত। হিন্দি তো বটেই, ইংরেজিতেও দারুণ সাবলীল ছিলেন তিনি। আইনজীবী হওয়ায়, তাঁর যুক্তির কাঠামোও ছিল মজবুত।

১৯৯৯ সালে দেশের প্রথম এনডিএ সরকারের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। পরে স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত বিলগ্নীকরণ মন্ত্রীও হন তিনি। ২০০০ সালে অবশ্য পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব পান অরুণ। রাম জেঠমালানির পর কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রকের দায়িত্বও তুলে দেওয়া হয় তাঁর কাঁধে।

আরও পড়ুনঃ প্রয়াত প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী অরুন জেটলি

সমান্তরাল ভাবে চলতে থাকে ওকালতিও। ১৯৮৭ সাল থেকেই দেশের বিভিন্ন হাইকোর্ট-সহ সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসাবে কাজ শুরু করেন তিনি। আইনজীবী হিসাবেও অতি দ্রুত উত্থান হয় তাঁর। মুকুটে প্রথম পালক যোগ হয় ১৯৮৯ সালে। বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহ সরকারের অ্যাডিশনাল সলিসিটর হিসাবে নিযুক্ত হন অরুণ জেটলি।

আইনজীবী হিসাবে এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দুটি মাইলস্টোন ছুঁয়ে গিয়েছিলেন অরুণ জেটলি। প্রথমমত, বাবরি মসজিদ ভাঙা থেকে হাওয়ালা কেলেঙ্কারির মামলায় তিনিই লালকৃষ্ণ আডবাণীর প্রধান আইনি উপদেষ্টা ছিলেন। দ্বিতীয়ত, বফর্স মামলা।

রাজীব গাঁধীর বিরুদ্ধে অভিযোগ পৌঁছেছিল আদালতেও। আর বফর্স নিয়ে আইনি লড়াইয়ের কাগজপত্র তৈরি হয়েছিল অরুণ জেটলির হাতেই। ২০০২ সালে বাজপেয়ী সরকারের আইনমন্ত্রী হন অরুণ জেটলি। মানালি থেকে রোটাংয়ের রাস্তায় পাথরের উপর বিজ্ঞাপন দিয়েছিল বেশ কয়েকটি সংস্থা।

পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগে এমন আটটি সংস্থাকে জরিমানা করে শীর্ষ আদালত। তার মধ্যে ছিল পেপসি-ও। ওই কর্পোরেট সংস্থার আইনজীবী ছিলেন অরুণ জেটলি। রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা থাকাকালীনও আইনজীবী হিসাবে যুদ্ধে নেমেছিলেন জেটলি। আইনজীবী হিসেবে জেটলির মক্কেলের তালিকায় ছিল দেশের প্রথম সারির কর্পোরেট সংস্থাগুলি।

বাজপেয়ী জমানার পরবর্তী সময়ে, রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা হিসাবে অরুণ জেটলিকেই তুলে আনেন লালকৃষ্ণ আডবাণী। বাজপেয়ীর সময় থেকে বর্তমানে নরেন্দ্র মোদীর আমল।

রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা থেকে প্রথম মোদী সরকারের অর্থমন্ত্রী। দেশের বিস্তৃত রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বহুমাত্রিক অবস্থান অরুণ জেটলির। বিজেপির এক অতি ভরসাযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন তিনি।

চোখধাঁধানো পলিটিক্যাল কেরিয়ার, উত্থানের সেই গ্রাফে মিশেছে ব্যর্থতাও। তাঁর আমলে গত পাঁচ বছরে জিডিপির হার নেমেছে অনেকটা। বাজারে চাহিদায় ভাটা। রেকর্ড পরিমাণ করেছে বেসরকারি লগ্নি। কর্মসংস্থানেও দিশা মেলেনি।

তাঁর হাত ধরে জিএসটি চালু হলেও, তা রূপায়ণ নিয়ে নানা সমস্যা রয়েছেই। রাজকোষ ঘাটতি সামলাতে পারেননি তাই থাবা বসাতে হয়েছে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের সঞ্চিত পুঁজির ভাঁড়ারে। তাঁর আমলেই, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সংঘাতের জেরে বিদায় নিতে হয়েছে রঘুরাম রাজন, উর্জিত পটেলদের।

দেউলিয়া বিধির মতো সংস্কার হলেও, অনাদায়ী ঋণের সমস্যার সমাধান হয়নি। কখনও প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তোলা, কখনও ব্যাঙ্কের আমানতের সুরক্ষাকবচ সরিয়ে দিয়ে সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলে তাঁকে পিছু হঠতে হয়েছে।

তিনি অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন, দেশ ছাড়েন বিজয় মাল্য, নীরব মোদী বা মেহুল চকসিদের মতো ঋণখেলাপিরা। আর সেই বিতর্ক এখনও বিরোধীদের হাতে ধারালো অস্ত্র। ২০১৪ সালে, ক্ষমতায় এলে কালো টাকা দেশে ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। সেই প্রতিশ্রুতি এখন কোথায় দাঁড়িয়ে তারও কোনও কিনারা হয়নি।

তা সত্ত্বেও, মোদী সরকারের প্রথম পাঁচ বছরে অরুণ জেটলি শুধু অর্থমন্ত্রী নয়, তাঁর ভূমিকা ছিল ‘ট্রাবলশুটার’-এর। কেন্দ্রীয় সরকার যখনই প্যাঁচে পড়েছে, তখনই ‘অরুণজি’-কে এগিয়ে দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী।

অর্থমন্ত্রী হয়েও জেটলি নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত আগে থেকে জানতেন কি না, সেই সংশয় পরেও মেটেনি। অথচ, নোট বাতিলের ‘লাভ এবং উপযোগিতা’ ব্যাখ্যা করতে নামতে হয়েছিল তাঁকেই।

জেটলির উপর প্রধানমন্ত্রীর আস্থা অনেক দিনের। ১৯৯৫-এ গুজরাতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর নরেন্দ্র মোদীকে দিল্লিতে কাজ করতে পাঠানো হয়।

সে সময় দিল্লির বাকি বিজেপি নেতারা তাঁকে বিশেষ গুরুত্ব দেননি, কিন্তু জেটলির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ২০০১-এ গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হন মোদী। ২০০২-এ গুজরাতে হিংসার পরে দলের মধ্যে বিতর্কে মোদীর পাশে ছিলেন জেটলি।

বাজপেয়ী বিরুদ্ধ অবস্থান নিলেও, লালকৃষ্ণ আডবাণীর সঙ্গে তিনিও মোদীর হয়ে সওয়াল করেন। গুজরাতের বিধানসভা ভোট নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংঘাতে মোদীর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে লড়াই করেছেন জেটলিই।

আইনজীবী হিসাবে সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছিলেন জেটলি। তবে, নির্বাচনে লড়ার ক্ষেত্রে অবশ্য ততটা সাফল্য পাননি। জেটলি নিজে শেষ বার ভোটে জিতেছিলেন ১৯৭৪ সালে দিল্লির ছাত্র সংসদের নির্বাচনে।

তার পর থেকে তিনি চলে গিয়েছিলেন মঞ্চের পিছনে। পরের চার দশক ধরে তিনি ‘ব্যাকরুম স্ট্র্যাটেজিস্ট’। বহু নির্বাচনেই দলের হয়ে রণকৌশল এবং প্রচার কৌশল তৈরির কারিগর ছিলেন তিনি।

গত লোকসভা নির্বাচনে অর্থাৎ ২০১৪ সালে দেশ জুড়ে প্রবল মোদী ঝড়। কিন্তু, তা অরুণ জেটলিকে ভোটে উতরে দিতে পারেনি। অমৃতসর থেকে ভোটে লড়ে পরাজিত হন তিনি।

তাতে অবশ্য মোদী বা দলের কাছে তাঁর গুরুত্ব কমেনি। প্রথম মোদী সরকারের অর্থ মন্ত্রক তো বটেই প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের দায়িত্বও ছিল অরুণ জেটলির কাঁধে।

কিন্তু, শরীরে বাসা বেঁধেছিল মারণ রোগ। একটু একটু করে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরেও আসতে থাকেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালের ভোটে আর দাঁড়াননি তিনি,
সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বকে কাজে লাগাতে ১৯৯৯-এ বিজেপির মুখপাত্র করা হয় জেটলিকে।

বাজপেয়ী সরকারের তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রক, আইন মন্ত্রক সামলেছেন। মনমোহন-সরকারের শেষ পাঁচ বছরে টু-জি, কয়লা কেলেঙ্কারির অভিযোগকে কাজে লাগিয়ে, রাজ্যসভায় আক্রমণাত্মক বিরোধী দলনেতা হিসেবে জেটলির ভূমিকা বিজেপিকে ফায়দা দিয়েছিল।

বিজেপির কাছে, সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল জেটলির রাজধানীর ‘নেটওয়ার্ক’। অন্য দলের নেতানেত্রী, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, আইনজীবী থেকে খবরের কাগজের মালিক, সম্পাদক জেটলির ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সংখ্যা ছিল ঈর্ষণীয়। নিজে যেচে উপকার করতেন। সাহায্য চাইলে শত্রুকেও ফেরাতেন না।

আর সুযোগ পেলেই পায়ের উপর পা তুলে জমিয়ে গল্পে মেতে উঠতেন। এ সব আড্ডায় নতুন তথ্য, যে কোনও বিতর্কে নয়া মোচড় ‘জেটলি স্পিন’ নামেই বিখ্যাত। শনিবার বেলা বারোটার পর থেকে অবশ্য এখন অতীত কালের তালিকায় ঠাঁই নিয়ে নিল।

রাজনৈতিক শিবিরের অনেকের মতেই, বাজপেয়ী ও আডবাণীর পর, বিজেপির দলীয় নীতির আত্তীকরণ যাঁরা করেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অরুণ জেটলি।

একদিকে আইনজীবী, অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতা। একদিকে সিরিয়াস রাজনীতির দৈনন্দিন চর্চা, অন্যদিকে প্রবল রসবোধ। নানা সম্পদের মিশ্রণে অরুণ জেটলি দিল্লির রাজনৈতিক মহলে সর্ব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।

রাজনৈতিক আদর্শের বিরোধিতা থাকলেও, অরুণ জেটলির রাজনীতির ‘স্টাইল’ বিরোধীদেরও অনেকেরই পছন্দ ছিল। শনিবার ভারতীয় রাজনীতির সেই পর্ব যেন থেমে গেল।

নিউজফ্রন্ট এর ফেসবুক পেজে লাইক দিতে এখানে ক্লিক করুন
WhatsApp এ নিউজ পেতে জয়েন করুন আমাদের WhatsApp গ্রুপে
আপনার মতামত বা নিউজ পাঠান এই নম্বরে : +91-9593666485