অশোক মজুমদারঃ

লেখক-বিশিষ্ট সাংবাদিক

➡সোজা কথা সোজাভাবে বলাই ভাল। গণপিটুনি কিন্তু কোন বিক্ষিপ্ত হিংসাত্মক ঘটনা নয়। এটা শাসকদলের ধর্মের ধুয়ো তুলে মানুষকে ভাগ করার একটা রাজনৈতিক কর্মসূচী। আমাদের খুব ছোটবেলায় শোনা একটা নাম এখনও আবছাভাবে মনে পড়ে। তিনি হলেন গান্ধিবাদী নেতা বিনোবা ভাবে। সর্বত্যাগী নিরহঙ্কার এই মানুষটি ভূদান ও গোরক্ষা আন্দোলনের সূত্রে সারা ভারতে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর প্রচুর সমালোচক ছিল। বামপন্থীরা তাঁর চিন্তাভাবনা নিয়ে বিদ্রুপ করতেন। কিন্তু তাঁর বিশ্বাস, নিষ্ঠা ও জনসেবামূলক কাজ নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলা যেত না। চম্বলের ডাকাতদের কাছেও তিনি খালি হাতে পৌঁছে যেতেন। আজকের হিংস্র, মারকুটে, বন্দুকধারী গোরক্ষকদের দেখলে বিনোবাজী বোধহয় হার্টফেল করতেন। স্বনির্বাচিত গোরক্ষকদের হামলায় দেশের বিভিন্ন রাজ্যে নিরীহ মানুষের মৃত্যু এবং আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ রোজই বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভেসে উঠছে। গোরক্ষা আর গণপিটুনি হয়ে উঠেছে এক সমার্থক শব্দ। মাঝেমধ্যে খুব অবাক লাগে, হতাশ হই। গরু চুরি কিংবা গরু পাচারের অভিযোগ তুলে এভাবে কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়! আরও অবাক লাগে যখন দেখি অমিত-মোদীরা এধরণের আক্রমণগুলোকে নানা কুযুক্তি সাজিয়ে সমর্থন করছেন। এটা বন্ধ করার ব্যাপারে তাদের যে কোন প্রশাসনিক, সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে সেটাই তারা মানেন না।

হিংসার একটা মনস্তত্ব আছে। যে কোন প্ররোচনা, গুজব, উস্কানিমূলক বিবৃতি দিয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষকে উত্তেজিত করে তোলা যায়। তাদের কে দিয়ে করিয়ে নেওয়া যায় নানা হিংসাত্মক কাজ। যারা একাজ করলেন তাদের বুদ্ধি বিবেচনা লোপ পায়। নানা কুযুক্তি খাড়া করে উত্তেজিত মানুষের সামনে পেশ করা হয় এক নিরীহ মানুষকে। তিনি খুন কিংবা সারা জীবনের মত পঙ্গু হয়ে যান। তার বিষয় সম্পত্তি উন্মত্ত জনতার আক্রমণে ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু যাদের সুপরিকল্পিত চক্রান্তে এমন ঘটনা ঘটল তারা কিন্তু ঠাণ্ডা মাথায় ঘুঁটি সাজান। এই ঘুঁটি সাজানোর একটা সাম্প্রতিক উদাহরণ দিলেই ছকটির আপনার কাছে জলের মতন পরিষ্কার হয়ে যাবে। আলোয়ারে গোরক্ষকদের হাতে মৃত আকবর খানকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পুলিশের সময় লেগেছিল তিন ঘন্টা। মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। বস্তুত গণপিটুনি একটা পরিকল্পনামাফিক হত্যাকাণ্ড। পরিকল্পনাটি বড় হলে তা গণহত্যার চেহারাও নিতে পারে। বিজেপির মত সাম্প্রদায়িক শক্তি ও লাশের রাজনীতির কারবারিরা এ খেলায় বিপুল দক্ষতা অর্জন করেছে। গোরক্ষকদের তাণ্ডব এই লাশের রাজনীতি এক সাম্প্রতিক নমুনা।

যে কোন ছুতোনাতায় শুরু করা গণপিটুনি এক সংক্রামক রোগ। মানুষের যাবতীয় যুক্তি বুদ্ধি এতে যেন হিংসা আর ঘৃণার ইরেজার দিয়ে মুছে ফেলা হয়। তখন আপনি আমি যে কেউ হয়ে যেতে পারি বিচারহীন এক নৃশংস মানুষ। এই পরিবর্তিত মানুষই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারবারিদের সবচেয়ে বড় অ্যাসেট। বিজেপির রাজনীতি যুক্তিবুদ্ধিহীন এই মানুষগুলোকে নিয়েই। এক বিজেপি জঙ্গি বলেছে গো হত্যা হলে গণপিটুনিও হবে। এই কুযুক্তি উঠে আসে এক হিংস্র ধর্মান্ধতা থেকে। এই হিংসাটাকে তার মনে বুনে দেওয়া হয়। কারণ, হিংসা না থাকলে সাম্প্রদায়িকতা উস্কে দেওয়া যাবে না। একটা জিনিস লক্ষ্য করবেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে দেশজুড়ে গণপিটুনি, দাঙ্গা, গণহত্যা, গণহিংসার মত ঘটনা বাড়ে। এটা মোটেই কোন কাকতালীয় ব্যাপার নয়।

এই গণপিটুনি ব্যাপারটা কিন্তু আমাদের ছোটবেলায় দেখা ছেলেধরা সন্দেহে কাউকে পেটানো বা পকেটমার সন্দেহে কাউকে মারা নয়। যদিও সেসব খুব ভাল তা বলছি না। এগুলির অধিকাংশেরই জন্ম একধরণের অজ্ঞতা বা ভ্রান্ত ধারণা থেকে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর পিছনে কোন সংগঠিত পরিকল্পনা থাকত না। যারা এতে যুক্ত থাকতেন কিংবা যারা তার শিকার হতেন, দুপক্ষই মূলত গরীব মানুষ। কিন্তু গোরক্ষার নামে মানুষ পিটিয়ে মারা একটি সংগঠিত হিংসা। এটা বিজেপির রাজনৈতিক কর্মসূচী। বেশ কয়েকমাস ধরে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় বহু মানুষকে গোরক্ষকরা পিটিয়ে মারছে। পশ্চিমবঙ্গেও মালদা, মুর্শিদাবাদ, দিনাজপুরে এই ঘটনা ঘটেছে। গরু পাচারকারী বলে হামলা চলছে ভিন্ন ধর্মের মানুষদের ওপর। সব দল একসঙ্গে মিলে অবিলম্বে এই ঘটনা বন্ধ করার জন্য পথে না নামলে কিন্তু এটা বন্ধ করা যাবে না। যে কোন অসহিষ্ণুতা মানুষে মানুষে বিভেদ বাড়িয়ে দেয়। জন্ম দেয় এক ফ্যাসিস্ট রাজনীতির। যারা আজ একাজ করছেন তারা কিন্তু আগুন নিয়ে খেলছেন। এতে একদিন তাঁদেরই হাত পুড়বে। কারণ, এর পরিণতিতে দলীয় রাজনীতির ব্যাপারটাই থাকবে না। আপনি ভাবুন, গোটা দেশজুড়ে একটাই দল, তার নাম হনুমান বাহিনী আর তারা গোরক্ষার নামে ভিন্নধর্মীদের পথে ঘাটে গণপিটুনি দিয়ে খুন করছে। আদতে খুন হচ্ছে মনুষ্যত্ব,সে বড় সুখের সময় নয়।

(মন্তব্য একান্তই লেখকের নিজস্ব)

নিউজফ্রন্ট এর ফেসবুক পেজে লাইক দিতে এখানে ক্লিক করুন
WhatsApp এ নিউজ পেতে জয়েন করুন আমাদের WhatsApp গ্রুপে
আপনার মতামত বা নিউজ পাঠান এই নম্বরে : +91-9593666485

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here