মুনাফা কেন্দ্রিক বাজার অর্থনীতির ইতরামিতে করোনা রুখতে কাহিল ধনতন্ত্রের গুরুঠাকুর আমেরিকা

    0
    227

    চন্দ্রপ্রকাশ সরকার

    সভ্য দুনিয়ায় এযাবৎকাল যতগুলি প্যানডেমিক বা অতিমারির ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে স্প্যানিশ ফ্লু সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী। আজ থেকে ঠিক শতবর্ষ আগে দুনিয়াজুড়ে প্রায় ৫ কোটি মানুষের প্রাণ কেড়েছিল ওই খতরনাক ফ্লু। মতান্তরে মৃতের সংখ্যা আরও বেশি। আমাদের এই ভারতভূমি নাকি স্প্যানিশ ফ্লুয়ের প্রধান মারণভূমি হয়ে উঠেছিল। একা ভারতেই বেঘোরে মারা পড়েছিল কোটি খানিক মানুষ! ভয়াবহ ভাইরাস ঘটিত ওই ইনফ্লুয়েঞ্জা শুরু হয়েছিল ১৯১৮-র জানুয়ারিতে। আর দুনিয়াজুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছিল ১৯২০-র ডিসেম্বর পর্যন্ত।

    USA | newsfront.co
    চিত্র সৌজন্যঃ নিউইয়র্ক টাইমস

    শুরু আমেরিকাতে হলেও তারা ঢেকেচেপে রেখেছিল ওই বিধ্বংসী ভাইরাসের কথা। স্পেনের একটি সংবাদপত্রে প্রথম ওই অতি সংক্রামক মারণব্যাধিটির কথা প্রকাশিত হয়। সেই অনুযায়ী নাম হয়েছিল স্প্যানিশ ফ্লু। পরবর্তীকালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা(WHO) পইপই করে বারণ করে দেয় যে, কোনও দেশের নামেই কোন ভাইরাসের নামকরণ করা যাবে না।

    Corona infection | newsfront.co
    চিত্র সৌজন্যঃ দি গার্ডিয়ান

    কিন্তু কে শোনে কার কথা! বিশ্বমোড়ল আমেরিকার বর্তমান বেপরোয়া কর্ণধার ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার করোনাভাইরাসকে ‘চীনা ভাইরাস’ নামে চিহ্নিত করে দিয়েছেন। এদিকে ট্রাম্প সাহেবের বক্ষলগ্ন মোদী সাহেবের সাঙ্গপাঙ্গরাও করোনাকে সামনে রেখে সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে দেওয়ালে দেদার লটকে দিচ্ছেন ‘কমিউনিস্ট চীন’ বিরোধী বিষোদ্গার।

    Corona Virus | newsfront.co
    চিত্র সৌজন্যঃ নিউইয়র্ক টাইমস

    কয়েকদিন আগে হোয়াটসঅ্যাপ বাহিত হয়ে আসা এক স্ট্যাটাসে দেখলাম জনৈক পণ্ডিতপ্রবর বিস্তর তথ্য-পরিসংখ্যান দিয়ে এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, চীনের ‘ঘৃণিত কমিউনিস্টরা’ স্বদেশের পঁয়ষট্টি-ঊর্ধ অনুৎপাদক মানুষদের ভরনপোষণের দায় এড়াতেই রীতিমত পরিকল্পনা করে তাদেরকে খতম করতে চেয়েছে, আর সেই লক্ষ্যেই ল্যাবরেটরীতে জন্ম দিয়েছে করোনাভাইরাসের! এই পথেই তারা নাকি নিজেদের আর্থিক মন্দার মোকাবিলা করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে চাইছে! লেখকের নামবিহীন ওই লেখাটিতে এক জায়গায় বলা হয়েছে, “আপাতত দুনিয়া ধুঁকছে। ধনে প্রাণে মরছে আর চীনের উল্লসিত ছবি আসছে।”

    Donald Trump | newsfront.co
    চিত্র সৌজন্যঃ নিউইয়র্ক টাইমস

    পণ্ডিতপ্রবরের কষ্টকল্পনার অসারতা প্রতিপন্ন করা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি কৌতুকবোধ করছি ভিন্ন কারণে। অন্য সময়ে যারা চীন-রাশিয়াসহ সারা বিশ্বেই সমাজতন্ত্র খতম হয়ে গেছে বলে আমোদ-আহ্লাদ করেন, সেই তাদের বিচারেই বিশেষ বিশেষ সময়ে চীন-রাশিয়া ‘সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হয়ে যায়! আর এইসব স্বঘোষিত সমাজতাত্ত্বিকদের বিচারে সমাজতন্ত্র আর কমিউনিজম অর্থাৎ সাম্যবাদ সমার্থক!

    সমাজতন্ত্রে জমি-জায়গা, কলকারখানা সহ যেকোনো উৎপাদন-যন্ত্র এবং পরিষেবা-পরিকাঠামোর ব্যক্তিগত মালিকানা স্বীকার করা হয় না। এটি হলো সমাজতন্ত্রের একেবারে গোড়ার কথা। গত শতাব্দীর শেষ দশক থেকেই রাশিয়া, চীন এবং পূর্ব ইউরোপের পূর্বতন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি ব্যক্তিমালিকানায় ফিরে গেছে। সুতরাং ওই দেশগুলিতে এখন পূর্ণমাত্রায় বিরাজ করছে ধণতন্ত্র। তবে তা করলেও সমাজতান্ত্রিক কিছু আচার-অভ্যাস ও জনকল্যাণের রাষ্ট্রীয় দায় তো থেকেই যায়। ওই সমস্ত দেশগুলি যখন ধণতন্ত্র থেকে সমাজতন্ত্রে উন্নীত হয়েছিল তখনও ধনতান্ত্রিক আচার-অভ্যাস, আশা-আকাঙ্ক্ষা সমাজজীবন থেকে পত্রপাঠ নির্বাসিত হয়নি। সেসব পুরাতন পিছুটানকে প্রতিহত করার সঠিক পন্থা-পদ্ধতি যথাযথ ভাবে অনুসৃত হয়নি বলেই কালক্রমে ধণতন্ত্র ফিরে এসেছে।

    তা ‘সাপ-ব্যাঙ-আরশোলা ও বাদুড়খেকো কমিউনিস্ট চীন’ তাদের বুড়োদের খতম-পরিকল্পনা থেকে সরে এসে করোনাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু ধনতন্ত্রের গুরুঠাকুর আমেরিকার কী অবস্থা আজ ? আজ ২৪ এপ্রিল রাত্রে এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত সে দেশে মৃতের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। গত ২৪ ঘন্টাতেই প্রাণ গিয়েছে তিন হাজারের বেশি মানুষের! ধনে-সম্পদে, বিজ্ঞানে-প্রযুক্তিতে, এবং বিশ্ববাসীকে অহরহ হুমকি দেওয়ার ক্ষেত্রেও, বিশ্বসেরা ওই দেশটির এহেন বেহাল দশা কেন? কেন করোনা-মৃত্যুতে ছাড়িয়ে গেল সারা বিশ্বকে? জনসংখ্যা তো মাত্র ৩২কোটি। আমাদের দেশে একা উত্তরপ্রদেশেই বসবাস করে ২২ কোটির বেশি মানুষ।

    আসলে অবক্ষয়িত ধণতন্ত্র বোঝে কেবল মুনাফা। মানুষের জীবন-মরণ তার কাছে গৌণ। আমেরিকায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা দাঁড়িয়ে রয়েছে স্বাস্থ্য বীমার উপর। সেটিও আরেকটি বেসরকারি ব্যবস্থাপনা। সে দেশের সমস্ত মানুষ ওই ব্যবস্থাপনার আওতাভুক্ত হতে পারেননি। যারা হয়েছেন তাদের বীমার টাকা শেষ হলেই রোগীকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা তিনি মরুন আর বাঁচুন ! বার্ধক্যগ্রস্ত পুঁজিতন্ত্র নিজের জান বাঁচানোর জন্য যে টোটকাটিকে আজ আশ্রয় করেছে, তার নাম বাজার অর্থনীতি।

    এই অর্থনীতির মূল কথাই হলো, ‘ফেল কড়ি মাখো তেল, তুমি কি আমার পর!’ কড়ি না থাকলে মর বেঘোরে! এটাই হলো আজকের অসার ধনবাদী অর্থব্যবস্থার সারকথা। মানুষ বুড়ো হয়েছে মানেই বাতিলের দলে, আর বাতিলের দলে চলে যাওয়া মানুষগুলোকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানোর চেয়ে তাদের পিছনে করোনা লেলিয়ে দেওয়ার ইতরতর চিন্তা যদি কেউ করতেও পারে তাহলে তা অবশ্যই মুনাফা সর্বস্ব ধনতন্ত্র।

    (লেখক মুর্শিদাবাদ থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘ঝড়’ সংবাদপত্রের কার্যনির্বাহী সম্পাদক, প্রাবন্ধিক। মতামত ব্যক্তিগত)

    নিউজফ্রন্ট এর ফেসবুক পেজে লাইক দিতে এখানে ক্লিক করুন
    WhatsApp এ নিউজ পেতে জয়েন করুন আমাদের WhatsApp গ্রুপে
    আপনার মতামত বা নিউজ পাঠান এই নম্বরে : +91 94745 60584

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here