তিন তালাক ,ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সঙ্ঘের রাজনীতি-গৌতম রায়।
তিন তালাককে অসাংবিধানিক বলে স্পষ্ট অভিমত ব্যক্ত করেছেন মহামান্য সুপ্রীম কোর্ট। স্বাগত সুপ্রীম কোর্টের এই রায়কে। এই রায় নিসন্দেহে দেশের আপামর শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের জয়। এই জয়ের পিছনে জানা – অজানা মুসলিম নারীদের জীবনপণ লড়াইকে হাজারো কুর্ণিশ।ধর্মান্ধ- মৌলবাদী শক্তি প্রথম থেকেই চাইছিল ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম প্রধান রাষ্ট্রগুলিতে বাতিল হয়ে যাওয়া এই তিন তালাকের কুপ্রথা বজায় রাখতে।মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড অত্যন্ত সক্রিয় ছিল এই যুগান্ধ তিন তালাককে বজায় রাখতে।তাঁরা তালাক – এ- বিদ্দত অবৈধ ঘোষণার আবেদন নিয়ে সায়রা বানু যে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন , তার পরিপ্রেক্ষিতে এই বছরের ২৭ শে মার্চ সুপ্রিম কোর্টে বলেছিল যে; তিন তালাক প্রথা খতিয়ে দেখার এক্তিয়ার দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নেই। যদিও মুসলিম উইমেন পার্সোনাল ল বোর্ড বহু আগেই এই যুগান্ধ প্রথা অবলুপ্তির পক্ষে নিজেদের অভিমত জানিয়েছিল।পাকিস্থান এবং বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ই তিন তালাক অবৈধ।
২০১৫ সালে সায়রা বানুকে তালাক দিয়েছিল তাঁর স্বামী।’১৬ সালে এই কুপ্রথার বিরুদ্ধে আদালতে যান সায়রা।উত্তরাখন্ডের সায়রার এই মামলার সঙ্গেই যুক্ত হয়েছিল হাওড়ার ইশরত জাহান, উত্তরপ্রদেশের গুলশান, জয়পুরের আফরিন, উত্তরপ্রদেশের ই আতিয়ারের মামলা। আটের দশকের গোড়াতে তালাক প্রাপ্ত শাহবানু খরপোষের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট শাহবানু খরপোষের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায় রাতের ঘুম কেড়ে নেয় মুসলিম মৌলবাদী শক্তির। এই রায়ের বিরোধিতাতে যেমন বামপন্থীরা সোচ্চার হন সংসদের ভিতরে এবং বাইরে তেমনি ই রায়ের বিরুদ্ধতাতে নানা পাঁয়তারা কষতে থাকে মুসলিম মৌলবাদী শক্তি।মুসলিম পার্সনাল ল বোর্ড সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সেদিন তীব্র চাপ সৃষ্টি করে রাজীব গান্ধী সরকারের উপর। সেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করেন রাজীব গান্ধী। সংসদে মুসলিম নারী অধিকার রক্ষা বিল এনে রাজীব ভেস্তে দেন সুপ্রিম কোর্টের সেই ঐতিহাসিক রায়কে।সেদিন দেশের প্রগতিশীল শিবির সমালোচনাতে মুখর হয়েছিল রাজীব গান্ধীর এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে।
লোকসভাতে সৈফুদ্দিন চৌধুরী এবং রাজ্যসভাতে দীপেন ঘোষ প্রতিবাদে মুখর হয়েছিলেন রাজীব গান্ধী সরকারের এই অন্ধকার অভিমুখী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে। প্রতিবাদ সেদিন কেবলমাত্র বামপন্থীদের পক্ষ থেকেই ধ্বনিত হয় নি। রাজীব গান্ধীর সেই তসশাচ্ছন্ন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মুখর হয়েছিলেন তাঁর ই মন্ত্রীসভার অন্যতম সদস্য আরিফ মহম্মদ খান। তিনি সেদিন মুসলিম নারী অধিকার রক্ষা বিলের ভিতর দিয়ে মুসলিম মেয়েদের কয়েকশো বছর পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাজীবের মন্ত্রীসভা এবং কংগ্রেস দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের আজকের মুখ্যমন্ত্রী এই তিন তালাকের প্রশ্নে সাম্প্রতিক বিতর্কে মৌনতা অবলম্বন করেছেন। যদিও তাঁর মন্ত্রীসভার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে তিন তালাক প্রথাকে ই কেবল সমর্থন করেন নি, এই প্রথার অবলুপ্তির ও চরম বিরোধিতা করেছেন। মমতা একটি বারের জন্যে ও তাঁর মন্ত্রীদের এই তিন তালাক প্রথাকে সমর্থনের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন নি।
মমতা অবশ্য তাঁর অতীতের ঐতিহ্যকে বজায় রেখেই মুসলিম মৌলবাদীদের সন্তুষ্ট করতে চেয়েছেন। রাজীব জমানাতে যখন শাহবানু মামলার রায়কে ভেস্তে দিতে সংসদে বিল এনে মূসলিম মেয়েদের আইন করে কয়েকশো বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল তখন সাংসদ হিশেবে মমতা কেবল নীরব ই ছিলেন না। সেই বিল কে তিনি সমর্থন করে মুসলিম মেয়েদের কয়েকশো বছর পিছিয়ে দিতে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। আজ যে মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড তিন তালাক প্রথার বিরুদ্ধতা করছে , সেই বোর্ডের অন্যতম সদস্য হলেন মমতার ই দলের লোকসভা সদস্য সুলতান আহমেদ।

সায়রা বানুর মামলাটি যখন সুপ্রিম কোর্টের বিবেচনাধীন , সেই সময়ে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির তাদের নিজস্ব কর্মসূচি,” অভিন্ন দেওয়ানী বিধি” র বিষয় টিকে সামনে নিয়ে আসার জন্যে হঠাৎ ই খুব মুসলিম মেয়েদের দুর্দশা নিয়ে তৎপর হয়ে ওঠে। তালাক বনাম তিন তালাক একটা ধোঁয়াশা তৈরী করে সামাজিক বিভাজনের পরিবেশ রচনার ভিতর দিয়ে মুসলিম সমাজের পশ্চাৎপদতা দেখাতে অতি মাত্রায় তৎপর হয়ে ওঠে। মুসলমান সমাজের ভিতর অন্ধত্ব নিবারণে তারাই একমাত্র তৎপর– এমনটা দেখাতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে হিন্দু মৌলবাদী- সাম্প্রদায়িক শক্তি।’৪৭ এর ক্ষমতা হস্তান্তর কালে মুসলিমদের ব্যক্তিগত আইন রক্ষার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তিন তালাকের প্রশ্ন কে ঘিরে তাকে গুলিয়ে দিতে আদা- জল খেয়ে নেমে পড়ে আর এস এস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই কাজে তারা নামিয়ে দেয় কার্যত বেতনভুক একদল দালালকে।তিন তালাকের অবলুপ্তি এবং আর এস এসের নিজস্ব কর্মসূচি;” অভিন্ন দেওয়ানি বিধি” লাগু করাকে একাত্ম করে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে ভেঙে তছনছ করে দেওয়াই হলো হিন্দুত্ববাদী শক্তির একমাত্র লক্ষ্য।
তিন তালাক ঘিরে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়কে আর এস এস- বিজেপি নিজেদের দলীয় কৃতিত্ব বলে দাবি করে ভিন্ন প্রকৃতির সোশাল ইনজিনিয়ারিংয়ের পাঁয়তারা ইতিমধ্যেই কষতে শুরু করে দিয়েছে।নিজেদের দালালদের দিয়ে এই তত্ত্ব তারা ইতিমধ্যেই বাজারে ছেড়েছিল যে; উত্তরপ্রদেশের বিগত বিধানসভার ভোটে নাকি তিন তালাক নিয়ে তাদের তথাকথিত দৃঢ় অবস্থানের জেরেই মুসলিম মেয়েরা ভোটে দু হাত উজার করে দিয়েছিল হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবিরকে। শেখ আখলাখ থেকে শুরু করে গোরক্ষার নাম করে মুসলমানদের প্রাণে এবং ভাতে মারার মূল কান্ডারী আর এস এস – বিজেপি যে কোনো অবস্থাতেই মুসলমানদের এতোটুকু ভালো চায় না– সেটা ভারতের মুসলমান সমাজ বোঝে। তাই সুপ্রিম কোর্টের রায়কে নিজেদের রাজনৈতিক হিন্দু রাষ্ট্র স্থাপনের লক্ষ্যে যাতে হিন্দুত্ববাদীরা কোনো অবস্থাতেই ব্যবহার করতে না পারে– সেদিকে সকলের নজর দেওয়া দরকার। তিন তালাকের মতোই রাজ্যসভাতে অনুমোদিত মহিলা সংরক্ষণ বিল লোকসভাতে পাশ করাতে কেন তৎপর নয় বিজেপি– এই প্রশ্নটাই এখন বড়ো হয়ে উঠছে।
দেশের সংবিধানের খোলনলচে বদলে দিতে আর এস এস- বিজেপি এখন আদা – জল খেয়ে নেমে পড়েছে। ভারতের সংবিধান থেকে ” ধর্মনিরপেক্ষতার” অবলুপ্তি ঘটাতে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক হিন্দুরা তৎপর। মোদি কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর যে তৎপরতা তাঁদের ছিল গত তিন বছর ধরে মোদির শাসনকাল চলবার পর সেই জিঘীষা এখন শতগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মোদির সুশাসনের বদলে বিভাজনের এবং আগ্রাসনের রাজনীতির ভিতর দিয়ে আর এস এস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি এই কাজ জোর কদমে করে চলেছে। যে রাজ্যে তারা জনতার রায়ে ক্ষমতায় আসতে পারছে না, সেখানে পিছনের দরজার যাবতীয় উপকরণকে তারা ব্যবহার করে চলেছে নগ্নভাবে। কোথায় এই কাজ তারা করছে দলীয় বা সঙ্ঘীয় লোককে রাজভবনে বসিয়ে রাজ্যপালের মাধ্যমে। আবার কোনো জায়গায় করছে অর্থশক্তির সাহায্যে। কোথাও বা করে চলেছে পেশী শক্তির মাধ্যমে। ভারতের প্রবাহমান ঐতিহ্যকে ভেঙে খানখান করে দিয়ে আর এস এসের ভাবধারা দেশের সবক্ষেত্রে লাগু করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে অসভ্য, বর্বর হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি।সেই উদ্দেশ্য নিয়ে ইতিমধ্যেই তিন তালাককে ঘিরে সুপ্রীম কোর্টের রায়কে তারা ব্যক্তি মোদির জয় হিশেবে দেখাতে সরটুকু মেহনত ঢালতে শুরু করে দিয়েছে।
প্রাচীন রোম সম্রাটরা মহাসমারোহে গ্ল্যাডিয়েটরের ষাঁড়ের লড়াই করতেন গোটা রোম জুড়ে।সম্রাটের অকর্মণ্যতা ভুলে সাধারণ তখন মেতে উঠতেন ওই ষাঁড়ের লড়াই দেখতে। ভুলে যেতেন তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের নানা সমস্যাকে। ভুলে থাকতেন পেটের জ্বালাকে।মাথার উপরে ছাদ না থাকার যন্ত্রণাকে।রোগে ওসুধ না পাওয়ার ব্যথাকে।এভাবেই ষাঁড়ের লড়াইতে মাতিয়ে দিয়ে সম্রাট নিজের অযোগ্যতা থেকে মানুষের দৃষ্টিটাকে বইয়ে দিতেন সম্পুর্ণ অন্যখাতে।
জন্মাষ্টমীকে কেন্দ্র করে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী স্বঘোষিত” যোগী” আদিত্যনাথ ওরফে অজয় সিং বিশওয়াত থানাতে এই ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রাচীন কালের রোম সম্রাটদের কথা একটু বেশি করেই মনে পড়ে যায়।জন্মাষ্টমী পালনের সূচনা পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভবনে করেছিলেন এ রাজ্যের বিদ্যুৎমন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় যাবতীয় ধর্মীয় বিধিবিধান মেনেই। খবরের কাগজের ছবিতে দেখা গেছে; সেই সময়ে মমতা মন্ত্রীসভার ওই বিশিষ্ট্য সদস্যের পাশে ছিলেন বিজেপির বিধায়ক তথা ওই দলের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। এভাবে রাজ্য আইনসভার ভিতরে আগে যেমন কোনো একটি বিশেষ ধর্ম পালন হয় নি– তেমন ই উত্তরপ্রদেশেও থানার ভিতরে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে জন্মাষ্টমী পালিত হয় নি।
উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী থানার ভিতরে জন্মাষ্টমী পালনের প্রক্রিয়াকে সমর্থন জানাতে গিয়ে মুসলমানদের পবিত্র ঈদের সময়ে নামাজ পড়বার ঘটনাকে টেনে এনেছেন। আদিত্যনাথ বোধহয় একটি ভাবনাও ভাবেন না যার পিছনে কোনো না কোনো সাম্প্রদায়িক অভিসন্ধি আছে। তাই গোরখপুরের হাসপাতালে শিশু মৃত্যু মিছিল থেকে মানুষের দৃষ্টিকে অন্য খাতে বইয়ে দিতে তিনি থানাতে জন্মাষ্টমী পালনের সঙ্গে পবিত্র ঈদের নামাজের তুলনা করে গোটা বিষয়টির ভিতরে একটা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ করে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিটাকে বইয়ে দিলেন অন্য দিকে। পাঠক মিল পাচ্ছেন কিনা ষাঁড়ের লড়াইতে ব্যস্ত থাকা রোম সম্রাটদের সঙ্গে?
মোদি সরকারের ভ্রান্ত অর্থনীতির জেরে গোটা দেশের আর্থিক পরিকাঠামো প্রায় ভেঙে পড়েছে। মোদি ঘনিষ্ঠ প্রথম সারির শিল্পপতিদের প্রায় যাবতীয় ব্যাঙ্ক ঋণ মুকুব করে দেওয়া হচ্ছে। অপরপক্ষে নয়া উদার অর্থনীতির অভিশাপ চাপিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনধারণের ন্যুনতম উপকরণগুলিকে দুর্মূল্য করে তোলা হচ্ছে। গ্যাসে ভরতুকি তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। এক ই অবস্থা হতদরিদ্রের ব্যবহৃত কেরোসিনের। অপর দিকে নোটবন্দীর ধাক্কা এখনো মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত সামলে ওঠার আগেই গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মতো চেপে বসেছে জি এস টির জ্বালা। মজার কথা হল; কেন্দ্র কিন্তু মিষ্টান্ন ব্যবসাকে জি এস টির ভিতরে আনলেও মদ আর পেট্রল কে রেখেছে জি এস টির আওতার বাইরে। এই জি এস টির ভিতর দিয়ে অর্থনীতি র বিকেন্দ্রীকরণ ব্যবস্থাকে সম্পুর্ণ জঙ্গম করে দিতে চায় মোদি সরকার। অর্থনীতির এই জঙ্গমতার ভিতর দিয়েই তারা চায় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ব্যবস্থার ও কেন্দ্রীকরণ।তিন তালাকের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে অবলম্বন করে প্রগতিশীল সাজতে চাওয়া মোদি সরকারের এখন মূল লক্ষ্য ই হলো ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বিনষ্ট করে এদেশের ফেডারাল স্ট্রাকচারটাকেও সমূলে উপড়ে দেওয়া।
WhatsApp এ নিউজ পেতে জয়েন করুন আমাদের WhatsApp গ্রুপে
আপনার মতামত বা নিউজ পাঠান এই নম্বরে : +91 94745 60584