২৩তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব

    0
    196

    ২৩তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবমানবেন্দ্রনাথ সাহা

    মানবেন্দ্রনাথ সাহা

    ১০ নভেম্বর থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত ২৩ কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে নন্দন সহ একাধিক প্রেক্ষাগৃহে দেখানো হলো দেশ বিদেশের প্রায় ১৮৫ টি ছবি। এর উদ্বোধন হয় ১০ নভেম্বর নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে। উদ্বোধন করেন প্রখ্যাত অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন, কমল হাসান, শাহরুখ খান, কাজল, পরিচালক মহেশ ভাট, মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী এবং ব্রিটেনের সুখ্যাত পরিচালক মাইকেল উইন্টারবটম। প্রচুর দর্শকের সমাগমে এই বিনোদন অনুষ্ঠান জমে ওঠে। অমিতাভ সিনেমার গান নিয়ে নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ পাঠ করেন। এইরকম বিনোদন বহির্ভূত সিরিয়াস চলচ্চিত্র উৎসবে শাহরুখ- কাজল – দেব-দের উপস্থিতি কেন সে প্রশ্ন অনেকেই চুপিসারে করেন! সস্তা বিনোদনের জন্য এই অনুষ্ঠান। সেই জন্য ইরানের ইয়োলো ছিল উদ্বোধনী ছবি। সেখানে স্বল্প দর্শক সেই প্রশ্ন তুলে দিয়ে যায়।

    এবারের চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য প্রদর্শিত ছবিগুলি নানা ক্যাটাগরিতে বিভক্ত ছিল। যার ভিতর উল্লেখ্য : ইন্টারন্যাশানল কম্পিটিসন, এশিয়ান সিলেক্ট, কনটেম্পোরারি মোরোকান সিনেমা, মাইকেল উইন্টারবটম রেট্রোস্পেকটিভ, সিনেমা ইন্টারন্যাশানাল, স্পেশাল ট্রিবিউট, ন্যাশনাল বেস্ট, সেন্টেনারি ট্রিবিউট প্রভৃতি। এই বিভাগগুলির মধ্যে মোরাকানের ছবি, উইন্টারবটমের ছবি আর কন্টেমপরারি ইন্টারন্যাশানাল ছবিগুলি বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে আগত দর্শকদের কাছে। ২০১৭-তে তৈরি নন-হলিউড বিদেশি ছবিগুলি দেখার জন্য এই উৎসবের দিকে তাকিয়ে থাকে কলকাতা ও মফস্বলের দর্শকেরা।
    অান্তর্জাতিক এই চলচ্চিত্র উৎসবে কয়েক বছর ধরে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এবারে তা আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এই পর্যায়ে আমার নির্বাচিত ছবিগুলি হলো : ডেথ অব এ পোয়েট, এ সর্ট ফ্যামিলি, সন অব সোফিয়া, কুপাল, বার্ডস আর সিংগিং ইন কিগালি, সাউন্ড অব সাইলেন্স, এ লেটার টু দি প্রেসিডেন্ট, ব্যালাড ফর্ম টিবেট, গুডবাই কাঠমান্ডু, দ্য লাস্ট ম্যুরাল।
    মোরাকোর সিনেমাগুলির ভিতর উল্লেখ্য : ফরগটন, জিরো, রাজিয়া। উইন্টরবটমের রেট্রো-তে তাঁর রোড মুভিসগুলি অন্য মাত্রা এনেছে। যেমন : ওয়েলকাম টু সেরেজাভো, দ্য রোড টু গুয়ান্তানামো, তৃষ্ণা, এভরিডে প্রভৃতি।
    কন্টেমপোরারি সিনেমা ইন্টারন্যাশানালের এক ঝাঁক টাটকা ছবির মধ্যে আছে : দ্য স্কোয়ার, ওয়াজিব, দ্য গডেস, মোর, সুইট কান্ট্রি, অন দ্য বডি এন্ড সোল প্রভৃতি।
    এই উৎসব শ্রদ্ধা জানিয়েছে বেশ কয়েকজন ভারতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বকে। তাঁদের ছবি দেখিয়ে।
    দেখানো হয়েছে ওম পুরী অভিনীত ছবি সদগতি, নব্যেন্দু ঘোষ পরিচালিত ছবি তৃষ্ণা, রবিন মজুমদার অভিনীত ছবি কবি, রামানন্দ সেনগুপ্তর চিত্রগৃহীত ছবি হেডমাস্টার, টম অলটার অভিনীত ছবি শতরঞ্জ কে খিলাড়ি।
    স্পেসাল ট্রিবিউট আর স্ক্রিনিং হিসেবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি দেখালো এই উৎসব। যার ভিতর আছে : আন্দ্রে ভাইদার ছবি আফটার ইমেজ, গোদারের ছবি গ্রানজার এন্ড ডিকেডেন্স অব এ স্মল ফিল্ম বিজনেস, উস্তাওলোর ক্লেয়ার অবস্কিওর প্রভৃতি।
    চলচ্চিত্র উৎসবের আরেকটি আকর্ষেণের জায়গা হলো সেমিনার, পরিচালক / অভিনেতার মুখোমুখি, অতিথি আর আড্ডা। এটাও ছিল জমজমাট। শেষ দুদিনের বৃষ্টি তাতে কিছু বিঘ্ন ঘটিয়েছে এবার। সেমিনারে আর সাংবাদিক সম্মেলনে, ফেস টু ফেস -এ মাতিয়েছেন উইন্টারবটম, কারিম দুকলি, প্রকাশ ঝাঁ, নামন রামচন্দ্রন, অশোক বিশ্বনাথন, অনুরাগ বাসু, সালমা বারগাস, ইমা জামালি, দিয়েগো, শেখর দাস।
    উৎসবের আড্ডায় টলিউডের অভিনেতা অভিনেত্রীদের সঙ্গে বলিউডের পুরনো নায়ক নায়িকা মৌসুমি -বিশ্বজিৎ জমিয়েদিয়েছেন। বাংলা আকাদেমির সভাঘরে ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ আয়োজিত ফেস টু ফেস জমে যায় প্রতিদিন দুপুরে। বই আর সিনেমার পত্রিকা বিক্রির আড্ডা জমত ভবানীপুর ফিল্ম সোসাইটির স্টলে।
    এই চলচ্চিত্র উৎসবে এবারের অভিনবত্ব হলো প্রখ্যাত ভারতীয় পরিচালক প্রকাশ ঝাঁর ক্লাস, বলিউডে বাঙালি শীর্ষক সোমনাথ রায়ের প্রদর্শনী। ভালোলাগেনি কারোরই তবু শুনে যেতেই হয়েছে ফেস্টিভ্যাল সিগনেচার টিউন। ভীষণ বিরক্তিকর। উৎসব অধিকর্তা যাদববাবু একটু ভেবে দেখবেন। ভালোলাগেনি ছবি শুরুর আগে দেখানে পিকাচার কোলাজটিও।
    ভালোলেগেছে যৌবনের উদ্দীপনা। প্রচুর তরুণ-তরুণী নিয়ম করে ছবিদেখেছে, আলোচনায় অংশ নিয়েছে, আড্ডা দিয়েছে ছবি নিয়ে।
    এবারের উৎসবের কয়েকটি নির্বাচিত( আমার পছন্দের) সিনেমার সংক্ষিপ্ত পরিচয় :
    ১. ওয়াজিব : প্যালেস্তাইনের এই ছবিতে দেখানো হয়েছে সীমান্ত মানুষকে ভাগ করতে পারে। হৃদয়কে নয়। জর্ডন -প্যালেস্তাইন সীমান্ত নিয়ে এই ছবি। শাদি রোম থেকে ফিরে আসে তার বোন আমলের বিয়েতে যোগ দিতে। পরম্পরা ও সম্পর্ক বজায় রাখতে বাবা হিসেবে ওয়াজিব তার কর্তব্য পালন করছে। পুত্রের কাছে যার কোনো মূল্য নেই।
    ২. কুপাল : ইরানের এই ছবিটি একেবার অন্যরকম। বর্তমান ভোগবাদী সমাজে আমরা নিজের নিরাপদ ভোগ দুর্গে নিজেরাই বন্দী। সেখান থেকে মুক্তি পেতে প্রিয়জনকে হত্যা করে আলোর সন্ধান চায়। কিন্তু সে আলো চিরমুক্তি দিতে পারেনা।
    ৩. আফটার ইমেজ : স্তালিন সমর্থক কমিউনিস্ট পোল্যান্ডে একজন চিত্রকার সরকারের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। নিজের স্বাধীন শৈল্পিক চেতনার জন্য কীভাবে কমিউনিস্টদের কুনজরে পড়ে, অনাহারে দুঃখে তাকে প্রাণ দিতে হয় সেটাই ভাইদার ছবিতে দেখানো হয়েছে।
    ৪. ডেথ অব এ পোয়েট : বাংলাদেশের ছবি। একজন কবির মৃত্যুর পর তার জীবনদর্শনের আলোয় সমকালকে তুলে ধরা হয়েছে সুররিয়ালিস্টিক নানা ইমেজের দ্বারা। শুধু ঢাকার পরিবেশ বিষাক্ত নয়, মনও বিষাক্ত হচ্ছে। কবি তাই প্রকৃতির ভিতরেই আরাম চান। ছবিটির পরিচালক আবু সঈদ।
    ৫.স্বামীর মৃত্যুর পর সোফিয়া তার ছেলেকে মানুষ করতে মরিয়া। জীবনে নানা সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করে না। কিন্তু ছেলে পালিয়ে বেড়ায়, বদ সঙ্গে পড়ে। তার নতুন বাবা তাকে রূপকথার গল্প শুনিয়ে ভালোর পথে আনতে চায়। ছেলে বাবাকে সহ্য করতে পারে না, খুন করতে চাই। শেষ পর্যন্ত মা সোফিয়া তাকে ফিরিয়ে আনে আলোতে। সে ফেরা অয়দিপউড কমপ্লেক্সের অদ্ভূত অনুরাগ আর মমত্বে।
    ৬. ক্লেয়ার অবস্কিওর : তুরস্কের ছবি। আধুনিক মনের এক মানসিক চিকিৎসক ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার থেকে একটি মেয়েকে উদ্ধার করতে গিয়ে দেখে মেয়েটি বাবার দ্বারা দীর্ঘদিন ধরে ধর্ষিতা। তার মনের সুলুক সন্ধানে এগিয়ে দেখে তার স্বামীর দ্বারা সেও এক ভায়োলেন্সের শিকার। শেষ পর্যন্ত তার এক সহকারী হয়ে ওঠে তার মন ও যৌনমুক্তির জায়গা।
    ৭. অ্যালানিস : আর্জেন্টিনার ছবি। যৌনতা কখনো আর্ট হয়েছে কখনো, কখনো বা বাঁচার মাধ্যম। যৌনকর্মীদের এই পেশা সমাজে নিন্দিত হলেও আধুনিক সভ্যতায় এর কদর বেড়েই চলেছে। চক্ষু লজ্জার আবেগকে ঝেড়ে ফেলে, নীতিকথা ছেড়ে দৃঢ়ভাবে আধুনিক সভ্যতার নগ্ন পেশাকে কটাক্ষ করে এই ছবি।
    ২৩ তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব সার্বিকভাবে সিনেমারই উৎসব। বিগত ১৭ বছর ধরে সেই ঐতিহ্য সে ধরে রাখার চেষ্টা করে আসছে। আরো ভালো পরিচালকের ছবি আনার খামতি আছে, কিছু বিচ্যুতিও আছে তবু এই উৎসব সিনেমারই জয়গান করে। তাই বার বার ফিরে আাসা এই চলচ্চিত্র উৎসবের নন্দন কাননে।

    কৃতজ্ঞতা :
    ১. সুদীপ ভট্টাচার্য
    ২. যাদব মন্ডল

    নিউজফ্রন্ট এর ফেসবুক পেজে লাইক দিতে এখানে ক্লিক করুন
    WhatsApp এ নিউজ পেতে জয়েন করুন আমাদের WhatsApp গ্রুপে
    আপনার মতামত বা নিউজ পাঠান এই নম্বরে : +91 94745 60584

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here