➡ওরা চেয়েছিল মাথাগোঁজার একটু আশ্রয়,কর্তৃপক্ষ ওদের দিল অবহেলা।অধিকার বুঝে নিতে অনশনের পথ বেছে নিল মেডিক‌্যাল স্টুডেন্টরা।

চলছে লড়াই

অনশনে কেটে গেছে বারোটাদিন, আজও উদাসীন মেডিকেল কর্তৃপক্ষ।সন্তানতুল্য ছাত্রছাত্রীদের সামান্য দাবী নিয়ে সমাধানের পথে না গিয়ে সরকারী অঙ্গুলি হেলনে নির্লজ্জ উদাসীনতায় উপেক্ষা যত বাড়ছে দাবী আদায়ের জেদে দৃঢ় হচ্ছে ছাত্ররাও।এ এক অসম লড়াই।সন্তানসম ছাত্রদের প্রাণের চেয়ে বড় কি এই ঔদ্ধত্য? নাকি অদৃশ্য পর্দার আড়াল থেকে কোন এক অঙ্গুলি হেলনে মেডিকেল কর্তৃপক্ষের এহেন আচরণ? ছুটে এসেছেন অনশনরতদের মধ্যে দেবাশিস বর্মণের মা-বাবা। মা ললিতা দেবী বলেন- ‘‘অনেক কষ্ট করে ছেলেকে পড়াশোনা করাচ্ছি। যে হস্টেলে ওরা থাকে সেটা থাকার মতো অবস্থায় নেই। এতো নিষ্ঠুর কীভাবে হতে পারে কলেজ কর্তৃপক্ষ? তাদেরও তো বাড়িতে ছেলেমেয়ে আছে। এই ছেলেমেয়েগুলোর কথা একবারও ভাবছে না! ’’ শুক্রবার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রামানুজ সিনহা ছাত্রদের সঙ্গে দেখা করতে গেলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। কথা বলতে গিয়ে গলা বুজে আসছিল তাঁর। বারবার সেই মা  করুণ আর্তি জানাচ্ছিলেন , ‘‘স্যার আমার ছেলেকে বাঁচান। ওদের দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন।’’ তবুও হৃদয় গলেনি।

মায়ের করুণ আর্তি

এখন এ প্রশ্নও উঠছে কোথায় সেই সুধীজন যাঁরা সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন বারবার। যাইহোক, সাড়া দিয়েছেন অনেকেই।তাঁদের মধ্যে আমরা যোগাযোগ করে উঠতে পেরেছি বেশ কয়েকজনের সঙ্গে।

আমরা নিউজফ্রন্টের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করে জানতে চাই তাঁদের প্রতিক্রিয়া। তাঁদের প্রতিক্রিয়ায় উঠে এল নানান মতামত। আমরা উঠে আসা মতামত প্রকাশ করলাম-

 

◼সমীর আইচ-চিত্র শিল্পী ও সমাজ কর্মী 👉

“আমার ছোটো ছোটো ডাক্তার ভাইবোনদের উচিত মেডিক‌্যাল কলেজের সামনের রাস্তা দখল করে অনশন করে লোককে জানান দেওয়া। যা ওই অনশন কক্ষে ঘটছে সবই সাধারণ মানুষের গোচরে নয়, তাই রাস্তা দখল করে অনশন চালাক অনশনকারীরা। বর্তমান সরকারের বাইরে চাকচিক‌্য ভেতরটা অন্ধকার। ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন, তাই দেখেও দেখছেন না। রাস্তার দখল নিলে হেলদোল হয়ত হবে। যে দাবীতে ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন তাতে আমার পূর্ণ সমর্থন আছে, আমি ওদের লড়াইয়ের পাশে আছি।”

◼কৌশিক সেন- অভিনেতা 👉

“আমি ব‌্যাক্তিগত ভাবে ভীষণ লজ্জিত। আমি সরকারকে দায়ী করছিনা, দোষী আমরাই। আমাদের উচিত ছিল তীব্র প্রতিবাদ করা। আমি ভীষণ হতাশ। স্বতস্ফুর্ত সামাজিক আন্দোলন একসময় প্রচন্ড আলোড়িত করত সবাইকেই, আজ সেই পরিস্থিতিই মৃতপ্রায়। আমি লজ্জিত আমাদের কৃতকর্মে। আমাদের অবস্থানে। তৃণমূলকে দায়ী করছিনা, তার কাছে এটাই অভিপ্রেত। এর বিরুদ্ধতাতে আমাদের অবস্থান নিয়ে আমি হতাশ।”

◼মন্দাক্রান্তা সেন- কবি ও সমাজকর্মী 👉

“ওদের দেখতে গিয়ে ভালো থেকো বলবার স্পর্ধা আমার হয়নি। কারণ ওরা ভালো থাকবার জায়গায় নেই। ওরা লড়াইয়ে আছে, খারাপ থাকবে জেনেই, ওদের দেখতে গিয়ে ভালো থেকো বলতে আমার দ্বিধা হয়েছে। একটা সঙ্গত দাবী যা অতি সহজেই মিটিয়ে নেওয়া যায়। হস্টেলের মাথার ওপর ভেঙে পড়ছে ছাদ, তার বিরুদ্ধে ভালো থাকবার দাবী জানিয়েছে ওরা, যা অত‌্যন্ত সঙ্গত। সরকারের এইভাবে মুখ ফিরিয়ে থাকার মানসিকতা ভীষণই প্রতিহিংসাপরায়ণ।”

◼সিদ্ধার্থ রায়(সিধু)-ডাক্তার,গায়ক(ক্যাকটাস ব্যান্ড) 👉

“হোস্টেল ভীষণ দরকার। বাইরের ছেলে মেয়ে পড়তে এসেছে। আস্তানা প্রয়োজনই। এটা ন‌্যায়সঙ্গত দাবী। কর্তৃপক্ষ সময় চেয়ে নিতে পারে, কিন্তু দাবীকে অস্বীকার করা ভীষণরকম অন‌্যায়।”

◼মিরাতুন নাহার- শিক্ষাবিদ 👉

“আমি দুইদিন গেছি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দেখা করতে। দুই ধরণের অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে ওখানে গিয়ে। তার ভিত্তিতে যে সিদ্ধান্তে এসেছি তা মর্মান্তিক। একধরণের ভৌতিক চাপ রয়েছে কর্তৃপক্ষের উপর। যার ফলে আমি দেখা করতে গেলে অপমানসূচক আচরন করে প্রিন্সিপ‌্যাল আমাকে বলেন ওদের রাজনীতি করতে নিষেধ করুন এবং ভীষণ ঔদ্ধত‌্যের সঙ্গেই আচরণ করেন। পরে আরেকদিন আমি গেছিলাম তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ ছিলেন বিনয়ী। দেখা করেন, কথাও বলেন কিন্তু ছত্রে ছত্রে প্রকাশ পাচ্ছিল অসহায়তা। সমগ্র বিষয়টি অঙ্গুলিহেলনেই ঘটছে, কিন্তু যার সঞ্চালনা তিনি মেডিক‌্যালের কর্তৃপক্ষ নন। কর্তৃপক্ষ নতিস্বীকার করেছেন দলীয় নেতাদের কাছে। ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটে গেছে। যা অত‌্যন্ত লজ্জাজনক ও ভীতির কারণ।”

◼পল্লবকীর্তনীয়া- ডাক্তার,গায়ক, সুরকার 👉

“সরকার আন্দোলনকারীদের বাজিয়ে দেখতে চাইছে, কিন্তু লাভবান হবেনা। ছাত্রদের হার না মানা জিদের কাছে মাথা নোয়াতেই হবে। জিতবে ছাত্ররাই। এরই মধ‌্যে যদি কোনো অঘটন ঘটে তার দায় সরকারের। মানুষ তাদের ছেড়ে দেবেনা।”

◼ডঃ অংশুমান মিত্র (সম্পাদক মেডিক্যাল সার্ভিস সেন্টার), ডাঃ সজল বিশ্বাস(সম্পাদক সার্ভিস ডক্টরস ফোরাম) ও ডাঃ স্বপন বিশ্বাস ( কোষাধ্যক্ষ সার্ভিস ডক্টরস ফোরাম) -এর যৌথ বিবৃতি 👉

মেডিকেল কলেজে অনশনরত ও আন্দোলনরত মেডিকেল ছাত্র-ছাত্রী ও চিকিতসকদের জানাই সংগ্রামী অভিনন্দন-

মেডিকেল কলেজ একটি প্রাচীণ, ঐতিহ্যমন্ডিত কলেজ। এই মেডিকেল কলেজে MBBS ছাত্রদের ছাত্রাবাসের ঘরের বন্টন ব্যবস্থা স্বচ্ছ ও বিঞগান সম্মত উপায়ে হওয়া উচিত। যা এই ক্ষেত্রে ভীষণ ভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। হস্টেলে ছাত্রদের ন্যায়সংগত দাবি তে গড়ে ওঠা ছাত্রদের অনশন আন্দোলন আজ ১০ দিন অতিক্রম করেছে। মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উচিৎ ছিল, আরোও সহানুভূতিশীল হয়ে হস্টেল-সংক্রান্ত সমস্যা দ্রুত সমাধান করা।

কিন্তু, কলেজ কর্তৃপক্ষের আচরণ অত্যন্ত নিন্দনীয়। আজ যখন কর্তৃপক্ষের উচিৎ ছিল MBBS পড়ুয়াদের সন্তানসম দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে সমস্যা নিরসন করা, সেখানে কলেজ কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত উদাসীন আচরণ করে চলেছে। অনশন আন্দোলন ভাঙ্গার জন্য ক্রমাগত ঘৃণ্য কৌশল নিয়ে চলেছে। শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি সরকারের এই দৃষ্টিভঙ্গীকে আমরা নিন্দা করছি। মেডিকেল কলেজগুলির সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক আধিকারিক হিসেবে DME ও দায়িত্ত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না।

আমরা আজ SDF ও MSC এর পক্ষ থেকে অনশন আন্দোলনের প্রতি সহমর্মিতা জানাতে গিয়েছিলাম।দাবী আদায়ের জন্য প্রয়োজন ধর্মনিরপেক্ষ,বামমনোভাবাপন্ন ,গণতান্ত্রিক মেডিকেল ছাত্র সংগঠন ও চিকিতসক সংগঠন গুলির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। যা এই সময়ে অনড় এবং সিদ্ধান্ত হীনতায় ভোগা স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রশাসন কে কিছুটা গতিশীল করতে পারতো। ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী আনদোলন গড়ে তুলতে আমরা সর্বতোভাবে সাহায্য করতে প্রস্তুত।

◼প্রদোষ পাল –চিত্র শিল্পী 👉

‌”আশ্চর্য লাগছে, প্রায় দশ বারো দিন হয়ে গেল, হস্টেলের দাবিতে অনিকেতরা অনশন করছে অথচ সরকার কোনো রকম পাত্তা দিচ্ছে না! যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২৬ দিন অনশন করে ক্ষমতা বদলের ভীত মজবুত করেছিলেন। মাত্র সাত বছরে এতোটাই হৃদয় হীন হয়ে পড়েছেন, কয়েকটা বাচ্চা ছেলে মৃতপ্রায়, তিনি এখানে ওখানে ছুটে বেড়াচ্ছেন, উপঢৌকন বিলিয়ে বেড়াচ্ছেন অথচ একবারও ছেলেগুলোকে দেখতে আসতে পারলেন না? কয়েকজন প্রতিনিধিকেও তো পাঠাতে পারতেন! ক্ষমতা কী এই, যা চেটে খেতে খেতে এতটাই হৃদয়হীন হয়ে যায় মানুষ?
যদি সত্যিও কোনো অঘটন ঘটে যায়, নিজেকে ক্ষমা করতে পারবেন তো!”

(ছবি-সংগৃহীত)

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here