বিভেদের সাইক্লোনের মাঝে, মিলনের সুরও বাজে

    0
    265
    আব্দুল খায়ের, ফ্রিল‍্যান্স লেখক।

    ছেলেটি বলেছিল বাড়ি ফিরে ইফতার করবে। করা হয়নি। বাড়ি ফিরলো তার প্রাণহীন দেহ। একটি জীবন্ত সতেজ প্রাণ জড়বস্তুতে পর্যবসিত হলো।ঠিক যেমন করে নিষ্প্রাণ হয়ে গিয়েছে আখলাক আরো অনেকে। এই মৃত্যুগুলি আমাদের সংবেদনশীল মননে ঢেউ তোলে যে ঢেউ আবার ভাটার টানে মিলিয়ে যায়।
    মানুষকে দিয়ে পশুবৎ কর্মসম্পাদন করাতে হলে তাকে পশুর স্তরে নামিয়ে আনতে হয়। আর তা করতে হলে মেরে ফেলতে হয় তার মধ্যের মনুষ্যত্ব-মানবিকতা-মূল্যবোধ-স্নেহ-প্রেম প্রভৃতি সুকুমারবৃত্তি গুলিকে। এই সুকুমারবৃত্তি গুলির অপমৃত্যু ঘটিয়ে মানুষকে জৈববৃত্তি প্রধান পশুত্বে পরিনত করতে হয়। তাই আখলাখ জুনেইদ বা আসগর আনসারিদের মৃত্যু শুধুমাত্র একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের কিছু মানুষের মৃত্যু নয় এ হচ্ছে মনুষ্যত্বের অপমৃত্যু।কারন একজন মানুষকে নৃশংস ভাবে হত্যার মধ্যে দিয়ে শুধু নিহত মানুষটির মৃত্যু হয় না মৃত্যু হয় হত্যাকারী মানুষটিরও নিহতের শারীরিক মৃত্যুর চেয়েও হত্যাকারীর মানবিক মৃত্যু সমাজের নিকট আরও বেশী ভয়ঙ্কর।

    কিন্তু কেন এই হত্যাযজ্ঞ?গোরক্ষার মধ্য দিয়ে দেশ সমাজের কি উন্নয়ন সাধিত হবে?আর একের পর এক এই হত্যাকান্ড যখন চলছে তখন ছাপান্ন ইঞ্চি ছাতি সমন্বিত বাকপটু দেশের প্রধানমন্ত্রী এক হিরন্ময় নিরবতা পালন করে চলেছেন।
    আসলে এই হত্যাযজ্ঞও এক উন্মাদনা। যে উন্মাদনায় আপাদমস্তক বানিজ্যিক স্বার্থভিত্তিক একটা খেলার জয় পরাজয়কে দেশপ্রেমের সঙ্গে একীভূত করে তোলা হয়। যে উন্মাদনায় ওসামা বিন লাদেনের দায় গাঁয়ের খেটে খাওয়া রহিম চাচার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে এক অদ্ভুত আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায় এ ও তাই। এই উন্মাদনা কিন্ত আপনা আপনি আসে না। বিশেষ আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটের পরিপ্রেক্ষিতে এ ধরনের উন্মাদনার সৃষ্টি করা হয়, শাসকের শাসন যন্ত্রকে সুচারু রূপে চালাতে।
    আজ যদি সমস্ত মুসলমান সম্প্রদায় গো-মাংস ভক্ষণ বন্ধ করে দেয় তবে কি এদেশের অনাহার দারিদ্র্য বেকারি নির্মূল হয়ে যাবে? দেশ মানে শুধু একটা ভূখণ্ড নয়, দেশ হল সেই দেশের মানুষ। আজ দেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে একটা বিপন্নতাবোধ। 2014 সালের সেপ্টেম্বরে বিশাল আড়ম্বরে প্রধানমন্ত্রী যে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া ‘কর্মসূচীর সূচনা করেছিল আজ তা মুখ থুবড়ে পড়েছে। সরকারী আর্থিক সমীক্ষার রিপোর্টেই বলছে, 2015-16 তে কর্মহীনতার হার বেড়েছে পাঁচ শতাংশ। বছরে 2 কোটি বেকারের চাকরি আজ নিছক ‘জুমলা’ বা কথার কথা। কৃষক শ্রমিক ছোটব্যবসায়ীদের নিদারুন পরিনতি উপলব্ধির জন্য পরিসংখ্যান ছাপিয়ে বাস্তবের দিকে তাকালেই উপলব্ধি করা যায়। ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেল্থ সার্ভে-4 (2015-16) তে উঠে এসেছে মোদীর গুজরাটেই সর্বাধিক শিশুমৃত্যু।ফলে চারিদিকে শুধু মৃত্যু হা- হা কার আর ‘নাই’ ‘নাই’ এর দীর্ঘশ্বাস। যা একজন শাসকের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে তোলে। ফলে সৃষ্টি করো উন্মাদনার। আর বিপন্ন মানুষ উন্মাদনায় সাড়া দেয় সবচেয়ে বেশি।
    প্রাক সক্রেটিস যুগের গ্রীক দার্শনিক হেরাক্লিটাস বলেছিলেন ‘ অন্ধ বিশ্বাস একটি পবিত্র ব্যাধি ‘ সকল শাসক সর্বযুগে সর্বকালে শাসিতকে এ ব্যাধিতে আক্রান্ত করতে চায়। কারন বিশ্বাসের নেশায় উন্মত্ত জনগণ আঘাতের যন্ত্রণাকে আদরের কোমল স্পর্শ ভাববে। বর্তমান ভারত সেই ব্যাধিতেই আক্রান্ত। কিন্তু এই ব্যাধি একদিনের ফসল নয় দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আজ তাকে এই রোগে আক্রান্ত করেছে। প্রতিটি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল জনগনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। জনগন চাইছিল মুক্তির পথ।আর ক্ষমতাসীন শাসক দল মানুষের সেই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে একের বিরুদ্ধে অন্যকে লেলিয়ে দিতে পারছে। আর তারই ফলশ্রুতি আখলাখ জুনেইদ।
    কিন্তু এখানেই কি শেষ? ইতিহাসের চাকা কি পশ্চাদমুখী হবে? ইতিহাসের ইতিহাস কিন্তু তা বলে না। মনে আছে রহমতকে? সুদূর আফগানিস্তান থেকে কন্যার আঙ্গুলের ছাপ বুকে নিয়ে পেশার তাগিদে এ দেশে এসে এদেশের কন্যা ‘মিনি’র মধ্যে খুঁজে পেয়েছিল নিজ কন্যাকে।জাত ধর্ম বর্ণ সামাজিক অবস্থানের উর্দ্ধে উঠে দুই পিতাকে একসূত্রে বেঁধেছিল তা হল কন্যা বিরহের যন্ত্রণা।রবীন্দ্রনাথের ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পের সেই অনুভুতিই ভিন্নরূপে আজ আমাদের গ্রথিত করেছে ঐক্যের হাত আজ প্রসারিত #নট ইন মাই নেম আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। শাসকের তৈরি বিভেদের বিষাক্ত বন্ধন ছিন্ন করে এই সঙ্ঘবদ্ধ হাত গুলিই তো আমাদের আলোর পথযাত্রী করে তুলেছে।

    নিউজফ্রন্ট এর ফেসবুক পেজে লাইক দিতে এখানে ক্লিক করুন
    WhatsApp এ নিউজ পেতে জয়েন করুন আমাদের WhatsApp গ্রুপে
    আপনার মতামত বা নিউজ পাঠান এই নম্বরে : +91 94745 60584

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here