প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার বিপদ

    0
    246

    প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার বিপদ-গৌতম রায়।

    শারদীয়া দুর্গা পূজোর বেশ কিছুকাল আগে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিমা নিরঞ্জনের নির্ঘন্ট ঘোষণা করেছিলেন। প্রথমে তিনি বলেছিলেন, বিজয়া দশমীর দিন রাত দশটার পরে আর প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া যাবে না। এই ঘোষণা যখন তিনি করেন তখনও বকরি ঈদ অনুষ্ঠিত হয়নি।মবলিঞ্চিং ঘিরে গত প্রায় এক বছর ধরে ভারতের রাজনীতি উত্তাল। অল্প কয়েকদিন আগেই জুনেইদের ঘটনাটি ঘটে গেছে।পশ্চিমবঙ্গের দিনাজপুরের চোপড়াতে একটি ঘটনা ঘটে গেছে।ধূপগুড়ির ঘটনা তখনো ঘটে নি।
    এই সময়কালেই দুর্গা প্রতিমা নিরঞ্জন সংক্রান্ত ঘোষণাটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী করেন। গোটা দেশে গোরক্ষকদের দাপটে যখন একটা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে তখন সামনে যে উৎসব রয়েছে, অর্থাৎ বকরি ঈদ সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী মমতার মুখ থেকে আমরা একটি শব্দও শুনতে পেলাম না। সেই ঘোষণার প্রায় দেড় মাস পর শারদ উৎসব।তিনি দেড়মাস আগেই শারদ উৎসবের শেষে প্রতিমা নিরঞ্জন সংক্রান্ত ঘোষণা করে দিলেন।
    মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার অল্প কয়েকদিনের ভিতরেই জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়িতে গোরু পাচারকারী অপবাদে দুটি স্কুল পড়ুয়া কিশোরকে বিভৎস নিষ্ঠুরতার সঙ্গে হত্যা করা হলো। নিহত দুজনই জন্মসূত্রে মুসলভান। এই দানবীয়তায় জড়িত থাকার সন্দেহে মমতারই পুলিশ যাদের গ্রেপ্তার করলো তাদের মধ্যে শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থক যেমন রয়েছে, তেমন ই আছে সঙ্ঘ পরিবার ঘনিষ্ঠ তথাকথিত গোরক্ষকদের চেলাচামুন্ডারাও।বিসর্জন ঘিরে তৎপর মুখ্যমন্ত্রী সংখ্যালঘু মুসলমানদের মুহররমের দোহাই বার বার দিচ্ছেন। অথচ আজ পর্যন্ত এই ধূপগুড়িতে গোরু পাচারের গুজব ছড়িয়ে নিরপরাধ দুটি মুসলমান কিশোর খুন সম্পর্কে কেন একটি শব্দ ও উচ্চারণ করেন নি? মমতার সংখ্যালঘু প্রীতির ভিতর যদি আদৌ কোনো বাস্তবতা এবং আন্তরিকতা থাকতো তাহলে অবশ্যই পেটের দায়ে অবসর সময়ে খালাসির কাজ করা সেই ধূপগুড়ির অসহায় স্কুল পড়ুয়াদের সম্পর্কে একটি দুটি শব্দ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যবহার করতেন।
    দুর্গাপূজোর সঙ্গে পবিত্র মুহররম পাশাপাশি উদযাপনের উদাহরণ আমাদের এই রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে আছে। চন্দ্রমাস অনুযায়ী মুহররমের দিন ঠিক হয়। ফলে প্রতি তিরিশ, বত্রিশ বছর অন্তর শারদ উৎসব এবং মুহররম একদম গায়ে গায়ে পালিত হওয়ার উদাহরণ এর আগে বহু আছে।অতীতের সেইসব দৃষ্টান্তের দিকে না তাকিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একতরফা ভাবে দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সার্বিক ভাবে একটা সামাজিক প্রতিক্রিয়া হতে শুরু হয়।
    গোটা বিষয়টি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বদান্যতায় এমনই দাঁড়ায় যে, বিজেপি এই বিসর্জনের ইস্যুটি নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়ে ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমে পড়ে।বিসর্জন ঘিরে মমতার অবস্থানের কারণে খুব সহজেই হিন্দু সাম্প্রদায়িক , মৌলবাদী শিবিরের পক্ষ থেকে এই রটনা করা অনেক সহজ হয়ে দাঁড়ায় যে, রাজ্য সরকার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে। বিসর্জন নিয়ে রাজ্য সরকারের অবস্থানকে মুসলিম তোষণ হিসেবে সরাসরি প্রচার করতে শুরু করে দেয় আর এস এস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি আর তাদের নানা রঙের সহযোগী সংগঠনগুলি।
    আদালত বিসর্জন নিয়ে সরকারী ফতোয়াকে স্বীকৃতি দেয় না।আদালতকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন মুখ্যমন্ত্রী।তিনি তাঁর বশংবদ সরকারি আধিকারিকদের দিয়ে বলান; দশমীর দিন নির্দিষ্ট সময়সীমার পর কোনো বিসর্জন দিতে গেলে পুলিশের অনুমতি লাগবে। বলাবাহুল্য, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কর্তাব্যক্তিদের ঘাড়ে কটা মাথা আছে যে তাঁরা তাঁদের সর্বময় কত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ” ইচ্ছে” র বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন? কোনো পুজো কর্তৃপক্ষ যাতে বেগরবাই না করতে পারে সেজন্যেও চেষ্টার ত্রুটি করেন নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পুজো সংগঠন গুলিকে দশ হাজার টাকার ” উপঢৌকন”ও তিনি ঘোষণা করেছেন মুক্তকন্ঠে। যেভাবে বিভিন্ন ক্লাব গুলিকে তিনি নিয়মিত পারিতোষিক বিতরণ করে থাকেন তার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো ক্লাবই যে তাঁর ” ইচ্ছে”র বিরুদ্ধাচারণ করবে না- তা আর বলবার অপেক্ষা রাখে না।
    মুখ্যমন্ত্রীর ” ইচ্ছে”র বিরোধিতা করবার ” স্পর্ধা” বা ” সাহস” কোনো পুজো কর্তৃপক্ষই যে দেখাবেন না – সেটা জানাই ছিল। বাস্তবে কেউ দেখানওনি। এক বিজেপি নেত্রী তাঁর দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি ” সাম্প্রদায়িকতা”র প্রচারে কসবার একটি পুজোর বিসর্জনকে কেন্দ্র করে কিছুটা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেও শেষপর্যন্ত হালে তেমন পানি পান নি।শেষপর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রীর ” ইচ্ছে” অনুযায়ী ” বিসর্জন কার্নিভাল” মহাসমারোহে সুসম্পন্ন হয়েছে।নাগরিকদের করের টাকায় মুখ্যমন্ত্রীর ” ইচ্ছে পূরণে”র বহু অভিজ্ঞতা এ রাজ্যের নাগরিকদের গত ছয় বছর ধরে হয়ে চলেছে।তাই হয়তো এখন আর ” তাঁর ” এই ধরণের ” ইচ্ছে পূরণে” জনচিত্তে তেমন একটা বিশেষ কিছু হেলদোল আর হয় না।তবে এই ” ইচ্ছে পূরণে”র ভিতর দিয়ে প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার যে ভয়ানক ছবি আমাদের সামনে উঠে আসছে তাকে ঘিরে প্রশ্ন কিন্তু মানুষের ভিতরে উঠতেই থাকছে। প্রশ্ন উঠছে; চলতি বছর বিজয়া দশমী আর মুহররম পাশাপাশি হওয়ার পর যে সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত এ রাজ্যের সচেতন মানুষ রেখেছেন তাকে ঘিরে সংবাদমাধ্যমের অতিরিক্ত দৃষ্টিপাতকে ঘিরে।
    এই সম্প্রীতির ছবি কি পশ্চিমবঙ্গে ব্যাতিক্রমী কিছু? তাহলে কেন কেবলমাত্র এই বছরই কিছু সংবাদমাধ্যম এরাজ্যের সম্প্রীতি নিয়ে একটু বেশি খবর করছেন? উত্ত সম্পাদকীয় লিখছেন? এঁরাই গতবছর (২০১৬) শারদ উৎসব উত্তর গোটা রাজ্যের নানা জায়গায় যে বিক্ষিপ্তভাবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা হয়েছিল, দাঙ্গা হয়েছিল — সেইসব খবরগুলিকে প্রায় ব্ল্যাক আউট করেছিল।সেদিন সম্প্রীতির প্রশ্নে সংবাদমাধ্যমের যে যথার্থ অবস্থান নেওয়া দরকার ছিল, বেশিরভাগ সংবাদপত্রই তা নেয় নি।জাতীয় স্তরের ইংরেজি সংবাদমাধ্যম গুলি ধারাবাহিক দাঙ্গা নিয়ে খবর করাতে তাঁদের খোদ স্বরাষ্ট্র সচিবের কটুক্তি পর্যন্ত শুনতে হয়েছিল।
    সেদিন বেশকিছু দাঙ্গাক্রান্ত এলাকাতে বর্তমান নিবন্ধকারের ব্যক্তি অভিজ্ঞতা হয়েছিল ; ওইসব এলাকার মানুষদের তৎকালীন তৃণমূল নেতা তথা সাংসদ মুকুল রায়ের ভূমিকাকে ঘিরে তোলা প্রশ্নের। বিশেষ করে মুকুলবাবুর ঘরলাগোয়া হাজিনগরের দাঙ্গার ক্ষেত্রে ওইসব এলাকার মানুষ সরাসরি এই দাঙ্গার পিছনে মুকুলবাবুর সঙ্গে আর এস এসের বোঝাপড়া নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন, প্রশ্ন তুলেছিলেন।আজ যে সংবাদমাধ্যমের অংশটি সম্প্রীতির প্রশ্নে প্রবাহমান বাংলার সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে একাসনে অধিষ্ঠিত করে আনন্দে উদ্বাহু হয়ে বগল বাজাতে শুরু করেছেন, তাঁরা মাত্র একটি বছর আগে কেন হীমশীতল নীরবতা অবলম্বন করে গিয়েছেন? সংবাদমাধ্যম যদি রাষ্ট্রযন্ত্রের তাঁবেদারে পরিণত হয় তবে তা কেবল গণতন্ত্রই নয়, সামগ্রিক ভাবে দেশবাসীর কাছে একটা বড়ো বিপদের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
    বিসর্জনকে ঘিরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর আপাতদৃশ্যমান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রকৃত অর্থে পরমমিত্র আর এস এস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির যে রাজনীতি তা সফল হওয়াতে উভয়কেই কার্যত খুশিতে ডগমগ দেখা যাচ্ছে।তাই যে মমতার অঙ্গুলিহেলনে আর এস এসের সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবতের সভার অনুমতি দিয়েও পরে তা বাতিল করলো মহাজাতি সদন কর্তৃপক্ষ , তা নিয়ে কথায় কথায় আদালতে যেতে অভ্যস্থ সঙ্ঘের প্রাদেশিক কর্তারা কিন্তু আদৌ আদালতের দ্বারস্থ হলেন না।প্রায় নীরবেই আর এস এসের প্রাদেশিক শাখার কর্তাব্যক্তিরা মহাজাতি সদনের পরিবর্তে ভগিনী নিবেদিতা সংক্রান্ত সঙ্ঘের ওই সভাটিকে স্থানান্তরিত করলেন অন্যত্র। এর পিছনে ও অবশ্যই রাজ্যের শাসক দল এবং তাঁদের অভিন্ন সুহৃদ আর এস এসের ভিতরে একটা গোপন বোঝাপড়ার ইঙ্গিতই প্রবল হয়ে ওঠে।
    মহাজাতি সদনের অছি পরিষদের কর্মকর্তা হিশেবে আছেন খোদ মমতা ক্যাবিনেটেরই সদস্য তথা খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক।প্রথমে সেখানে মোহন ভাগবতের সভার অনুমতি দেওয়া হয়।প্রয়োজনীয় টাকাও জমা নেওয়া হয়।মমতার পুলিশ ও প্রয়োজনীয় অনুমতি দেন।হঠাৎই মহাজাতি সদন কর্তৃপক্ষ সেখানে সাউন্ড সিস্টেম পরীক্ষার অজুহাতে অনুমতি বাতিল করে দেয়।এই ঘটনাটি নিয়ে প্রচারের একটা বাড়তি মাইলেজ পেয়ে যায় আর এস এস।মজার কথা হলো , বিসর্জন নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থানকে পক্ষপাত দুষ্ট বলে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছে আর এস এস – বিজেপি।তাঁদের ঘনিষ্ট লোকজনেরা এ নিয়ে আদালতেও গেছেন।আদালতের রায়কে মমতা তাঁর জয় হিসেবে দেখাতে চাইলেও আদালতের রায় যে মমতার খামখেয়ালীপনার গালে একটি একটি বিরাশি সিক্কার থাপ্পড়– তা আর বলবার অপেক্ষা রাখে না।
    সেই অবস্থাতে আদালতের কাছে ও আমি মাথা নোয়াইনা- কার্যত এটা বোঝাতেই মমতা বিসর্জন ঘিরে পুলিশের অনুমতির প্রসঙ্গ তুলে কার্যত আদালতকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন।বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষও একটু আধটু তর্জন – গর্জন করলেন বই কি! কিন্তু দেখা গেল, বিসর্জন প্রক্রিয়ার নামে মমতার ” ইচ্ছে” তে কার্নিভাল চলাকালীন শহরের একপ্রান্তে সভা করলেন সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত। সেখানে বেলুড় মঠের গ্রন্থাগারিক স্বামী ত্যাগিবরানন্দ কমিউনিষ্টদের আদ্যশ্রাদ্ধ করলেন।এক প্রাক্তন সাংবাদিক স্বঘোষিত তত্ত্বের অবতারণা করে বললেন; বামপন্থীরা নাকি জাতীয় আন্দোলনে নিবেদিতার ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেয় না।অথচ আর এস এস প্রধান মোহন ভাগবত কিন্তু সেই সভাতে একটিবারের জন্যে ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তাঁর নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার বা তাঁর পরিচালনাধীন তৃণমূল কংগ্ৰেসের সমালোচনা করে একটি শব্দ ও উচ্চারণ করলেন না।
    কেন তাঁর সভা একটি তুচ্ছ অছিলাতে মহাজাতি সদনের মতো একটি ঐতিহ্যমন্ডিত প্রেক্ষাগৃহে করতে দেওয়া হলো না- তা নিয়েও একটি বারের জন্যে প্রশ্ন তুললেন না মোহন ভাগবত।আর এস এসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি প্রকাশ্যে খানিকটা লোকদেখানোভাবে তৃণমূল কংগ্রসের বিরোধিতা করে থাকে।লক্ষণীয় বিষয় হলো এই যে, বিজেপির মূল চালিকা শক্তি আর এস এস কিন্তু একটিবারের জন্যে ও তৃণমূল কংগ্রেস বা তার সর্বেসর্বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমালোচনা করেনা বা তাঁর সম্পর্কে একটিও নেতিবাচক কথা বলে না।বরঞ্চ মমতা নিজে তো কদিন আগে আর এস এস মিশনারীধাঁচে কাজ করে — এইরকম শংসামূলক কথাও আর এস এস সম্পর্কে প্রকাশ্যে বলেছেন এই বিসর্জনকে কেন্দ্র করে।
    বিসর্জনকে কেন্দ্র করে মমতা যে প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিলেন তার ফসল ঘরে তুলতে উৎসুক আর এস এস প্রকাশ্যে কখনোই মমতা সম্পর্কে এতোটুকু নেতিবাচক শব্দ উচ্চারণ করে না।অতীতে বাজপেয়ী মন্ত্রীসভার সদস্যা মমতাকে আর এস এস ” দেবী দুর্গা” র সঙ্গে তুলনা করেছে। গত ডিসেম্বরেও কলকাতাতে মোহন ভাগবতের সভার অনুমতি দেয়নি মমতা প্রশাসন। আর এস এস এ নিয়ে আদালতে যায়। আদালতের নির্দেশে তাঁরা সভা করে মোহন ভাগবতকে নিয়ে। সেই সভাতেও মোহন ভাগবত মমতা সম্পর্কে একদম নীরব থেকে কার্যত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি তাঁর নীরব সমর্থনই জ্ঞাপন করে গিয়েছিলেন। এরপর এই বছর বিসর্জনকে নিয়ে বিতর্কের অবকাশে আর এস এসের “মিশনারী কার্যক্রমে”র কথা প্রকাশ্যে স্বয়ং বলেছেন মমতা।উভয়ের বন্ধুত্ব , বোঝাপড়া এবং বন্দোবস্তি সম্পর্কে তাই আলাদা করে কিছু বলবার এতোটুকু অবকাশ নেই।
    বিসর্জন ঘিরে মমতার অবস্থান কি আদৌ সংখ্যালঘু সমাজের কাছে তাঁকে বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলবে? মোল্লাতন্ত্রের একটি ছোট অংশকে তিনি খুশি করতে পারেন। তাবলে আপামর মুসলমান সমাজ মোল্লাতন্ত্রের দ্বারা পরিচালিত হন- এমনটা ভাববার দিন এখন আর নেই। তাই যদি থাকতো তাহলে একদা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরই দক্ষিণহস্ত মাথায় সম্বল করে সমাজের উপর ছড়ি ঘোড়ানো টিপু সুলতান মসজিদের স্বঘোষিত” শাহী” ইমাম বরকতির এমন করুণ পরিণতি দেখতে হতো না।গোটা দেশের মতোই বাংলার মুসলমান সমাজ ও এখন আলোর পথযাত্রী ।তাঁরা আধ্যাত্মিকতায় বিশ্বাস রাখেন।তাই বলে ধর্মীয় কুসংস্কারের বেড়াজালে তাঁদের জীবনকে আবদ্ধ রাখবার উপক্রম দেখা দিলে তাঁদের ভিতর থেকেই প্রতিবাদ ওঠে।প্রতিরোধ ধ্বনিত হয়।তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন পবিত্র মুহররমের দোহাই দিয়ে দুর্গা প্রতিমা নিরঞ্জন স্থগিত রাখার কথা বলেছিলেন, তখন এই বাংলারই মুসলমান সমাজের একটি বড়ো অংশ তাতে তাঁদের প্রবল আপত্তির কথা জানিয়েছিলেন।
    মমতা যদি প্রকৃত অর্থে পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সমাজের মুখের ভাষা পড়তে জানতেন, তাহলে দেখতেন যে; এরাজ্যের মুসলমানদের বেশিরভাগই আর কেবলমাত্র মুসলমান বলে প্রান্তিকতার বেড়াজালে আবদ্ধ থাকতে চান না। তাই তাঁরা বুঝেছিলেন যে, যদি পবিত্র মুহররমের দোহাই দিয়ে প্রশাসনিকস্তর থেকে দুর্গা প্রতিমা বিসর্জনকে আটকে দেওয়া হয় তাহলে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি বাড়তি অক্সিজেন পেয়ে যাবে। সেইকারণে ই যে মুসলমান সমাজের তথাকথিত ” মসীহা” হিশেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে মনে করেন, সেই মুসলমান সমাজেরই প্রগতিশীল মানুষরা, সমাজসচেতন মানুষরা জোর গলায় বলেছিলেন; পবিত্র মুহররমের দিন দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন বন্ধ রাখবার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই।
    সংখ্যালঘু সমাজ বিসর্জন বন্ধের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি সঙ্গত কারণেই। কিন্তু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিসর্জন বন্ধের ফতোয়া হাইকোর্ট কর্তৃক নাকচ হয়ে যাওয়ার পরও পুলিশের অনুমতি সাপেক্ষ বন্ধ রেখেছিলেন এই কারণেই যে, এটা না করলে প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা যে অক্সিজেন পাবে না।মমতার স্বাভাবিক মিত্র আর এস এস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির শ্রীবৃদ্ধি ঘটবার সুযোগ যে হবে না।

    বিশিষ্ট অধ্যাপক ও লেখক গৌতম রায়

     

     

     

     

     

     

     

     

    *(লেখকের বক্তব্য একান্তই নিজের।এরজন্য নিউজফ্রন্ট কতৃপক্ষ দায়ী থাকবে না)*

    নিউজফ্রন্ট এর ফেসবুক পেজে লাইক দিতে এখানে ক্লিক করুন
    WhatsApp এ নিউজ পেতে জয়েন করুন আমাদের WhatsApp গ্রুপে
    আপনার মতামত বা নিউজ পাঠান এই নম্বরে : +91 94745 60584

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here