বৈভব আর বর্ণময়তায় উদযাপিত আন্তর্জাতিক মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ উৎসব

0
149

মানবেন্দ্রনাথ সাহা

(অধ্যাপক,বিশ্বভারতী, বিশিষ্ট চলচ্চিত্র সমালোচক)

বিগত কয়েক বছরের মতো এই বছরও উৎসবের রঙিন বর্ণময়তায় উদযাপিত হলো আন্তর্জাতিক মুর্শিদাবাদ রেসারগেন্স ফেস্টিভাল যা হেরিটেজ ফেস্টিভাল নামে সমধিক পরিচিত। এই ব্যতিক্রমী উৎসবের আয়োজক মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ ডেভালপমেন্ট সোসাইটি। এবারে উৎসবের উদ্বোধন করেন ব্রিটিশ ডেপুটি হাই কমিশনার মাননীয় মিঃ ব্রুস বাকনেল।
গত ৬ ও ৭ ডিসেম্বর মুর্শিদাবাদের আজিমগঞ্জ শহরে সূচনা হয় এই বছরের মুর্শিদাবাদ আন্তর্জাতিক হেরিটেজ ফেস্টিভালের

নিজস্ব চিত্র

আজিমগঞ্জ শহরে হেরিটেজ ওয়াকের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা। যার উদ্দেশ্য হেরিটেজ ঐতিহ্য সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, ভালোবাসা জাগানো। বড়নগর টেরাকোটা শিবমন্দিরে গিয়ে এর সমাপ্তি হয়।
আজিমগঞ্জ শহরের হেরিটেজ ঐতিহ্য পুরনো ভবন ও জৈন মন্দির গুলি অতিথিদের দেখানো হয়।
পরম আদরে শ্রী সিদ্ধার্থ দুধোরিয়া তাঁর পৈত্রিক বাসভবন অতিথিদের ঘুরিয়ে দেখান। চমৎকার স্থাপত্যে এই ভবন নির্মিত। তবু একে সঠিকভাবে সংস্কার করতে না পারার বেদনা অনুভব করেন সিদ্ধার্থবাবু।
দুধোরিয়া পরিবারের হেরিটেজ বিল্ডিং বড়া কুঠি। এই পরিবারের সদস্যরা তাদের ভালোবাসা নিয়ে অতীতকে মুখরিত করে তুলেছেন। এই ভবনের অধুনা সংস্কার অতীত ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে এনেছে। এই বড়াকুঠিতেই বসে হেরিটেজ বিষয়ক এবারের আন্তর্জাতিক সেমিনার। সেখানে আলোচনা করেন বিদেশি বিখ্যাত আলোচক। যাদের অনেকেই আর্কিটেক্ট।

নিজস্ব চিত্র

বড়াকুঠি পরিবারের পক্ষে আলোচনা করেন দর্শন দুধোরিয়া এবং কাশিমবাজার রাজবড়ির পক্ষেবলেন পল্লব রায় ।মালেয়শিয়া, কানাডা, ইংল্যান্ডের বিভিন্ন আলোচকেরা তাঁদের আলোচনাতে বোঝান কীভাবে হেরিটেজ বিল্ডিংগুলি বাঁচাতে হবে। এর সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের অতীত ঐতিহ্য ও সময়। সেমিনারের সঞ্চালক ছিলেন কমলিকা বসু।ধন্যাবাদ জানান মি: বাকনেল এবং হেরিটেজ সোসাইটির পক্ষে সন্দীপ নওলাক্ষা।
সেমিনারের পর বড়াকুঠির ধারে সুরম্য গঙ্গা তীরে আতসবাজির মধ্য দিয়ে সূচিত হয় সান্ধ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। নদী বক্ষে সিল্ক রিভারের শিল্পীরা প্রদর্শন করেন এক বর্ণময় সিল্কের দীর্ঘ স্ক্রোলের। এ এক হেরিটেজ ও সংস্কৃতির মেল বন্ধন। বাউল ফকির কাওয়ালি গানে নদী বক্ষে জমে যায় সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা দেশ বিদেশের উপস্থিত দর্শক শ্রোতারা উপভোগ করেন এই অনুষ্ঠান
দুপুরবেলা এই প্রতিনিধি দল কাশিমবাজার রাজবাড়ি পৌঁছলে ফুল ছড়িয়ে সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে স্বাগত জানান শ্রীমতী সুপ্রিয়া রায় সহ রায় পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের আন্তরিক আতিথেয়তায় মধ্যাহ্ণভোজনের পর গোটা রাজ বাড়ির সংগ্রহশালা ঘুরিয়ে দেখানো হয়। পুরনো হেরিটেজ বিল্ডিংকে পরম মমতায় এরা বাঁচিয়ে রেখেছেন , সংস্কার করেছেন। সীমাবদ্ধতাও কিছু আছে।

নিজস্ব চিত্র

মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ উৎসবের পরিসরকে আরো বৃদ্ধি করেছে স্লিক রিভার প্রোজক্ট। এটি একটি কালচারাল ও হেরিটেজ প্রোজেক্ট। ৪০০ বছর ধরে মুর্শিদাবাদ তথা ভারতবর্ষের সিল্ক বাণিজ্যের প্রসার
এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এই প্রোজেক্টের জন্ম।
উৎসবের দ্বিতীয় দিন ৭ ডিসেম্বর মুর্শিদাবাদের হাজারদুয়ারিতে সিল্ক রিভার প্রোজেক্টের বর্ণাঢ্য পদযাত্রা শীতের দুপুরে অন্যমাত্রা পায়। শতাধিক আগত প্রতিনিধি সুদৃশ্য সিল্ক পতাকে নিয়ে হাজারদুয়ারির সামনে প্রদক্ষিণ করেন।
কাশিমবাজার রাজবাড়িতেই পারস্পরিক ভাববিনিময় ও সাংস্কৃতিক আদান প্রদানে শেষ হলো এবারের হেরিটেজ উৎসব। মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ ডেভলপমেন্ট সোসাইটির কর্ণধার সন্দীপ নওলাক্ষা এই আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন উৎসবের প্রধান পুরোহিত। তাঁকে সহযোগিতা করেছেন সিদ্ধার্থ দুধোরিয়া সহ সোসাইটির সদস্যরা। বড়াকুঠি পরিবারের সদস্যদের আন্তরিকতা উৎসবকে আত্মিক করে তুলেছে। সন্দীপবাবু জানান, ” হেরিটেজ ফেস্টিভাল এখন আর মুর্শিদাবাদের উৎসব নয়, এ উৎসব এখন আান্তর্জাতিক। হেরিটেজ রক্ষার পাশাপাশি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে হবে” বলে তিনি জানান। তিনি আরোও বলেন : হেরিটেজ রক্ষা পায় সংগঠনে নয়, মানুষের ভালোবাসায়। মানুষকে সচেতন করতেই এই উৎসব। ”
এরপর আগত প্রতিনিধিদের মুর্শিদাবদের নির্বাচিত কয়েকটি হেরিটেজ ভবন দেখানো হয় যার মধ্যে আছে হাজারদুয়ারি, ওয়াসিফ মঞ্জিল বা নিউ প্যালেস, কাঠগোলা মন্দির।
মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন উৎসবের ধারায় এই বৈভব ও বর্ণময় উৎসব এক আর্ন্তজাতিক পরিসর তৈরি করেছে সন্দেহ নেই। আমরা এই উৎসবে যোগ দিয়ে অতীত সময়ের নস্টালজিয়ায় আচ্ছন্ন হয়েছি। আবার কীভাবে এই হেরিটেজ উত্তরাধিকারকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে তার পাঠ নিয়েছি। এখানেই উৎসবের সার্থকতা। রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের আর্থিক সহায়তা পেলে এইসব হেরিটেজ ঐতিহ্য রক্ষিত হবে। শুধু জীবন বাঁচালেই চলবে না আমাদের অতীত জীবনের মধ্যে যে সৌন্দর্য, যে ঐতিহ্য ছিলো তাকেও বাঁচাতে(সেভ) হবে। এই উৎসব আমাদের সেই শিক্ষাই দিয়ে গেল।
হেরিটেজ উৎসবে যোগ দিয়েছেন কানাডা, ইংল্যান্ড, জার্মানি, টোবাগো-ত্রিনিদাদ, মালেয়শিয়া সহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের শতাধিক মানুষ।

নিউজফ্রন্ট এর ফেসবুক পেজে লাইক দিতে এখানে ক্লিক করুন
WhatsApp এ নিউজ পেতে জয়েন করুন আমাদের WhatsApp গ্রুপে
আপনার মতামত বা নিউজ পাঠান এই নম্বরে : +91 94745 60584

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here