হেমন্তের আকাশে শৈশব, খেলছে আজও

    0
    40

    অচিন্ত্য রায়

    খোলা আকাশের স্বপ্ন চুরি করবার একটা সময় প্রতি বছর আসে।সময়টাকে আমরা সহজভাবে বলি হেমন্ত।উন্নত শহর যখন ক্যামেরার লেন্সে চলচিত্রের শর্ট নিতে ব্যস্ত, তখন আমরা বাস্তবিক একটা চলচিত্র বিনা পয়সায় দেখতে থাকি,নীল আকাশের সোনালী ধানক্ষেত রোদ্দুর মাখা সাপের দেহের মতো চকচকে বাদামী আল,বিষণ্ণ শামুকখোলের ঠোঁট থেকে উঠে আসা আস্ত সরল উপন্যাস।এখানে নায়ক বা খলনায়ক, কোন চরিত্র নেই, তবুও আতপ চালের আলপনার মতো ধবধবে।গরুর গাড়ির চাকা ধুলাময় রাস্তায় গড়গড়িয়ে যায়, বুকে ভয়হীন অদম্য শিশুদের লপ্পায় শৈশব ঘুরে বেড়ায়।এখান থেকেই উৎসবের আরম্ভ।কৃষকের কথা মাথায় এলেই বাবার ঘর্মাক্ত দেহটা জলচিত্রের মতো আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে, মনে পড়ে যায় হৈমন্তিক মাঠের কথা…

    তখন বয়স খুব অল্প, কাজ মানেই গায়ে জ্বর, বাবা কিন্তু সেসব কথা শুনতেন না। ভোর হলেই কান খড়কে থাকতাম এই বুঝি-বাবা ডাকলেন,একরকম আতঙ্ক আচমকা আচমকা ঘুম ভাঙিয়ে দিত।শেষ পর্যন্ত ডাকতেনও, ব্যতিক্রম ঘটেনি কোনদিন।চাঁদ ডুবে যাওয়া দেখতে দেখতে, গায়ে চাদর মুড়ি দিয়ে ছ্যাঁকছ্যেঁকে অগ্রাহয়নকে শরীরে মাখতে মাখতে যখন বড়ো রাস্তা ছেড়ে মাঠের আলে ‘পা’ রাখতাম-গাছপালায় আলোর মাতঙ্গ ঝুলে পড়তো। কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পরেই শুধু কাস্তের শব্দ শুনতে পেতাম, চোখের প্লটে বিঘার পড়ে বিঘা ধানের পাঁচ-হালার লাশ অনায়াসে শুয়ে পড়েছে, ধানকাটা মেশিন নয়-কৃষকের ধারালো কাস্তের আঘাতে।

    যখন জমির পাশে এসে দাঁড়াতাম, দমকা বাতাস আমাদের পালে, পাল দেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিত। আমরাও যুদ্ধে নেমে পড়তাম, যুদ্ধ কতটুকু করতাম, সবটাই বাবা করতো।আমরা দুইভাই কেবল- একটু আধটু যুদ্ধ করে-সূর্যের লাল আভায় সমস্ত মাঠ দৌড়ে বেড়াতাম।কেঁচমাটি মাখা শামুক, মাঠ চড়ুইদের সন্ধানে, ধানের জাঙ্গিতে জাঙ্গিতে ধান খুঁটে পেট ভরে যেতে।ফড়িং ধরতে গিয়ে হাতে কুলেখাড়া কাঁটার আঘাতে রক্তাক্ত হতাম।যন্ত্রনা ভুলে যেতাম-যখন নতুন ধুতি পড়ে চাষীরা ঘরের উদ্দেশ্যে মোট বয়ে নিয়ে আসত,আমাদের হাতে ভরে দিতো,চিনি মাখা ভিজে চাল,ওটাই যন্ত্রনার ঔষধ হিসাবে সেবন করতাম।

    এতক্ষণ যে দৃশ্য চলচিত্রে চলছিল তা কেবল ভূমিকার পরে একটু স্বাক্ষরিত করা মাত্র।এবার আসল পটভুমি শুরু।যেখানে শুধু জাঙ্গি থেকে মাঠ, মাঠ থেকে খামার, খামার থেকে পালুই’র গল্প। তোষলা, ঈতুপুজার গল্প, যাতি ফুলের ভেঁপুর গল্প, নবান্নের গল্প সবটাই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে এবং সমস্ত উৎসব গুলোয় হেমন্তের আউশকে ঘিরে।যেমনভাবে মাঠময় ছুটে বেরাচ্ছিলাম ,এখন ধান উঠে এসেছে খামারে, এখন আর আমরা একা নয়, পাড়ায় অনেক ছেলেমেয়ে একসাথে মিলে লুকোচুরি খেলছি সন্ধ্যা পর্যন্ত।খেয়াল নেই, কখন যে ঘুঘুপাখি, পায়রা, হুমপাখিদের ঝাঁক বাসায় ফিরে গেছে, শঙ্খের ধ্বনিতে আমাদের খেলা সাঙ্গ হলে বেরিয়ে দেখলাম পাড়ার মা,কাকিমা,বৌদিরা গরদে শাড়ি পড়ে খামারে ছড়া-জল দিচ্ছে, বাড়ি ফিরে দেখি’ বাকুলময় ছোড়দি সাঁঝ পুজার মই,মড়াই,নাঙল,জোয়াল,পেঁচা,লক্ষী চরন এঁকেছে।নতুন ধানের মৃদু গন্ধ আসছে আমাদের উঠান দিয়ে,পাশের বাড়ির স্বর্গবাতি’টা উঠে গেছে নক্ষত্রের কাছে।এবার সত্যি মনে হল সন্ধ্যে নেমেছে…

    এইভাবে কৃষকের অঙ্গনে পরিশ্রম,আনন্দ একসাথে খেলা করে দুটো মাস, ধানকাটা, ধানতুলে আনা, ধান ঝাড়া, মড়াইবাঁধা,  শরীর খড়িমাটির মতো সাদা হয়ে যায়। তবু চোখে-মুখে একদীঘি আনন্দ, যখন মা পুকুর ঘাট থেকে ঘট আম শাখায় জল ভরে গোলার সামনে বসে প্রদীপ জ্বালিয়ে লক্ষ্মীর পাঁচালী পড়ে, নবান্নের নতুন চালের পাঁচ ভাজা,একথালা ভাত,পায়েস বাবার সামনে বেরে দেয়, বাবা গামছাটা কাঁধে নিয়ে চোখটুকু মুছে আগে গন্ধটা শোঁকে….তারপর বলে- কোথায় কষ্ট,  সব ভুলে গেছি, তারপর আমরা একসাথে খাই। মা গরদে শাড়ির আঁচলের খুদ উথান্ম্য ছড়িয়ে দেয়, পাখিরা উড়ে আসে, পরম আনন্দে খায়।

    ওদের কাছে কৃষকরা এটুকুই আশীর্বাদ চায়।  তোমরা খাও…যতখুশি, খাওয়ার পরে যেটুক থাকবে আমাদের ও রেখো ধনধান্য।নেপথ্যে শিশিরের ছন্দ বাজতেই থাকে, বৃষ্টির মতো মাঠের চতুর্দিকে শুনতে পাই গরুর খুড়ে ঘুঙুরের আওয়াজ।মৃত্যুর চোখগুলো পল্লীর দিকে চেয়ে থাকে, হতাশায়, এই দুঃখমাখা আনন্দকে কিভাবে বয়ে নিয়ে যাবে শ্মশানে । সে নিজেও যে উৎসবের ভাগীদার ।সামান্য ঘাই লাফিয়ে পেরিয়ে যমরাজ অনেকটা কাছে এলেও, ব্যর্থতা তাকে তিলনাড়ু, মুড়কি নাড়ু দিয়ে নিজের গন্তব্যে ফিরিয়ে দেয়।এত আনন্দ হারিয়ে, হেমন্তে স্বর্গীয় কোন দরখাস্তে পূরন হবে না বলেই কৃষক ঘোষণা।জীবন মৃত্যু সর্বদা ধ্রুবক।হেমন্তটা না হয় আমাদেরই হোক…

    নিউজফ্রন্ট এর ফেসবুক পেজে লাইক দিতে এখানে ক্লিক করুন
    WhatsApp এ নিউজ পেতে জয়েন করুন আমাদের WhatsApp গ্রুপে
    আপনার মতামত বা নিউজ পাঠান এই নম্বরে : +91-9593666485