ডঃ তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়

শক্তি যখন কবি হিসেবে কিছুটা প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন সেইসময় তিনি বেশ কিছু গান রচনা করেছিলেন। সেগুলি সেইসময় কেউ সুরারোপ করে গান হিসেবে গেয়েছিলেন কিনা জানা যায় না। হয়তো তিনি গানগুলি রচনা করে ভবিষ্যৎ-কালের জন্যে রেখে দিয়েছিলেন, যদি কেউ সেগুলি সুরারোপ করে গান হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু তাঁর এই ‘গান’-গুলি এখনো পর্যন্ত সুর-সংযোগে তেমন রূপ লাভ করেনি।
বাংলা গানের সঙ্গে তাঁর যোগ ছিলো আবাল্য। গ্রামীণ পরিবেশে যখন তাঁর বাল্যের দিনগুলি অতিবাহিত হয়েছিলো সেইসময় বহড়ুর আশেপাশে প্রচলিত বিভিন্ন লোকগান তাঁর পরিচিত ছিলো একথা জানা যায়। বিভিন্ন লোকগান, বাউল গান, যাত্রাগান তাঁর পরিচিত ছিলো। বাল্যকালে পারিবারিক বৃত্তে মাসীর কাছে ও বেতারে রবীন্দ্রনাথের গান শুনতেন। কলকাতায় এসে পারিবারিক বৃত্তে ভাই-বোনদের কাছে রবীন্দ্রনাথের গানও শুনেছেন বিভিন্ন সময়। রবীন্দ্রনাথের গান পরবর্তীকালে তাঁর অন্যতম প্রিয়-গান ছিলো। একটি লেখায় রবীন্দ্রনাথের গান সম্বন্ধে বলেছেন -– ‘রবীন্দ্রনাথকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম ওঁর গান শুনে। রবীন্দ্রসঙ্গীতই আমার সবচেয়ে প্রিয়। আমার নিজের মনে হয় অনুভূতির সুক্ষ্ম ও গভীর প্রকাশ অত্যন্ত সাবলীল ও সার্থক হয়ে উঠেছে রবীন্দ্রনাথের গানে’। তবে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন দেবব্রত বিশ্বাস ও কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায় রবীন্দ্রনাথের গানই তাঁর সবচেয়ে বেশিপছন্দ’। তাঁর যৌবনকালে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও অজয় চক্রবর্তীর গলায় রবীন্দ্রনাথের গান শুনেছেন ও আন্দোলিত হয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি রবীন্দ্রনাথের গানকে ব্যক্তিজীবনের সুখ-দুঃখের আশ্রয় বলে মনে করেছেন। বলেছেন– ‘এবং তোমার গানে আমি নিই সহজ নিঃশ্বাস’ (তুমি তারই পূজা নেবে)। প্রসঙ্গত স্মরণীয় সুখ্যাত গায়ক হেমন্ত মুখোপাধ্যায় (১৯২০ খ্রি – ১৯৮৯ খ্রি) তাঁর বাল্য-জীবন কাটিয়েছিলেন বহড়ু গ্রামেই। শক্তির জন্মস্থান ছিলো এই গ্রাম। এক হিসেবে দুজনে একই গ্রামে নিজেদের বাল্যকাল কাটিয়েছিলেন। শক্তির হেমন্ত-প্রীতির অন্যতম কারণ ছিলো এটি।
১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রায় এক-নাগাড়ে ছত্রিশটি গানরচনা করেছিলেন শক্তি। তাঁর গানের সংকলনের একটি গান ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দের রচনা (আসে মেঘ বৃষ্টি হয়)। এই ছত্রিশটি গানের দু-একটি হয়তো কোথাও প্রকাশিত হয়েছিলো। তবে এই গানগুলি নিয়ে তিনি পরবর্তীকালে তেমন উচ্চবাচ্য করেন নি। তাঁর মৃত্যুর পরে এগুলি ‘পদ্যসমগ্র-৬’ (১৯৯৯ খ্রি)-তে সংযুক্ত হয়েছে। তবে এগুলি যে অবধারিতভাবে গান সে বিষয়ে সন্দেহের নিরসন করেছেন শক্তি নিজেই। ‘গান’ নাম দিয়েই এগুলি চিহ্নিত করা ছিলো। শিরোনামে ১, ২, ৩ এই ক্রম দেওয়া আছে। গানের ওপরে কোনো তাল বা রাগের উল্লেখ নেই। যে কোনো গানের যে মূল অন্তর্গঠন – স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী, আভোগ এই বিভাজনও রক্ষিত হয় নি। গানের এই চতুরঙ্গের মধ্যে ভাবের প্রকাশের যে স্তরপরম্পরা থাকে তাও এখানে রক্ষিত হয় নি। কয়েকটি গানের প্রথম চরণটি শেষকালে ধ্রুপবপদের মত পুনরুক্ত হয়েছে। ছত্রিশটি গানের মধ্যে বারোটি গান অসম-পঙ্‌ক্তিবিন্যাসে রচিত হয়েছে। বাকি চব্বিশটি গান সম-পঙ্‌ক্তিবিন্যাসে রচিত। সব কয়টি গানেই অন্ত্যমিল সুচারুরূপে রক্ষিত হয়েছে।
শক্তির কবিতায় রবীন্দ্রনাথের গানের পঙ্‌ক্তি বা পঙ্‌ক্তির অংশ অনেকবার ব্যবহৃত হয়েছে। ‘এই বসন্তে বৃষ্টি হবে’ কবিতায় – ‘নীল দিগন্তে ফুলের আগুন’। ‘পুনর্বিবেচনা’ কবিতায় – ‘ও চাঁদ চোখের জলে লাগল জোয়ার’। এছাড়া অন্যান্য কবিতায় রবীন্দ্র-গানের দু-একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন নিজের মত করে, যেমন ‘উতলা হল আজি’, ‘গোঠে আসে না রাখাল ছেলে’, ‘কাঁদে না মোহন-বাঁশীতে’ ইত্যাদি। কবিতার নামকরণ করেছেন রবীন্দ্র-গানের চরণাংশ নিয়ে, যেমন ‘ছিন্ন পাতায় সাজাই তরণী’, ‘যখন বৃষ্টি নামল’ ইত্যাদি। কিন্তু লক্ষ্যণীয় বিষয় তাঁর রচিতগানে তিনি রবীন্দ্রনাথের গানের অংশ গ্রহণ করেন নি। কিন্তু গানগুলি নিবিষ্টভাবে পড়লে দেখা যাবে যে, প্রায় সব কটা গানেই রবীন্দ্রনাথের গানের প্রতিধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের বিপুল পরিমাণ গানের তিনটি বিভাজন করা হয়। শক্তির ৩৬/৩৭ টি গানের তেমন বিভাজন করা যায় না। তাঁর সব কটি গানই মূলত প্রেমের গান। আরো স্পষ্ট করে বলা যায়, সব কটি গানই প্রেম-ব্যর্থতার গান। যে প্রেম রবীন্দ্রগানের মতই কখনো ছুঁয়ে থাকে পরিপার্শ্বের ভূমা প্রকৃতিকে, আবার কখনো তা ব্যাপ্ত হয়ে যায় বিশ্বপারাবারের বিভিন্ন অনুষঙ্গে। সে কারণে অনেক ক্ষেত্রেই গানে চলে আসে রবীন্দ্রনাথ ব্যবহৃত শব্দ, উপমা, চিত্রকল্প ও প্রতিমান। চলে আসে অনায়াসে বিভিন্নরকম প্রাকৃতিক অভিজ্ঞান।
শক্তি যখন এই গানগুলি রচনা করেছিলেন সেইসময় তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থ হল ‘অনন্ত নক্ষত্রবীথি তুমি অন্ধকারে’। এইসময়েই বাংলায় ‘হাংরি কবিতা আন্দোলন’ ভীষণ সাড়া ফেলেছিলো। ‘ধর্মে আছো জিরাফেও আছো’ কাব্যের কবিতাও এই সময়কালের মধ্যে রচিত হয়েছে। এর কিছুদিন পরেই তাঁর সঙ্গে আলাপ হবে মীনাক্ষী বিশ্বাসের সঙ্গে, পরে যিনি তাঁর সহধর্মিনী হবেন। ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দের সময়কাল শক্তির জীবনে প্রেম-ব্যর্থতা বা নিঃসঙ্গতার কাল বলা যেতে পারে। এইসময় থেকেই তাঁর জীবনে একটা বন্ধনহীনতার মনোভাব গড়ে ওঠে।
তাঁর রচিত গীত-সংকলনের প্রথম গানটিতে আছে সন্ধ্যার তরঙ্গহীন জল যেন কথা বলে ওঠে। তার তীরে জোনাকিরা খেলা করে। সেখানে দূর দেশে যাবার আহ্বান শোনা যায়। গানটির মূল কথা ধ্বনিত হয়– ‘তোমার কথাই শুধু আন্দোলন করি মনে-মনে’ এই বলে। দ্বিতীয় গানটি শুরু হয় একটা রাবীন্দ্রিক ভাষ্যে –
এ-প্রাণ তোমার গানে উঠবে আবার রেঙে
এ-প্রাণ তোমার টানে চলবে উজান ভেঙে।
ফেলে আসা প্রেমিকের আহ্বান এসে পৌঁছয় ঘাটের কিনারে। বিচ্ছেদের বেদনা ধ্বনিত হয়েছে, যখন আকাশের চাঁদ মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। সেদিনের সেই অসহ্য নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তির জন্যে ব্যর্থ প্রেমিক নিজের হৃদয়-দুয়ার খুলে অপেক্ষমান। ৩ সংখ্যক গানটিতে আসে রাত, সন্ধ্যা, উতলা দিন ও ধূসর দেশের কথা। একদিন নদীতীরে বাসাবাড়ি ছিলো। সেখানে তাল-সুপারির বাগান ছিলো। ফুলের সম্ভার আর উন্মুক্ত খামার ছিলো। এই গানটিতেও একটা বিচ্ছিন্নতার বোধ গীতিকারের মনের চতুর্দিকে ব্যাপ্ত হয়েছে বলে বোঝা যায়। ৪ সংখ্যক গানটিও রবীন্দ্র-গানের অনুষঙ্গে সমৃদ্ধ। এসেছে সন্ধ্যার আবহ, দূরের পাহাড় পেরিয়ে যাবার আহ্বান। আছে ছুটি, ঋণ, দরদিয়া, ‘উজাড় করা হৃদয়’ প্রভৃতি শব্দাবলী। বলেছেন –
আলোর ঋণে বাঁধো আমার হিয়া
ওগো আমার দিনের দরদিয়া।
বিরহের মধ্যে, ব্যর্থতার মধ্যে এক কল্পিত-মিলন ও বিরহের স্বর্গলোক রচনার প্রয়াস আছে। এখানে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা নেই, ব্যর্থতার জ্বালা তেমন তীব্রতর নয়। ৫ সংখ্যক গানটি শুরু হয়েছে ‘মাঘ নিশিথের কোকিল’ শব্দবন্ধ দিয়ে। এই শব্দবন্ধটি জীবনানন্দের কবিতায় ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু সেখানে যে অনুষঙ্গে এটি উদ্ধৃত, এখানে তা আলাদা ভাবনার পরিধি নির্মাণ করেছে। এখানে সেই কোকিল যেন আলোকের বার্তা বয়ে নিয়ে এসেছে। সে যেন তার মনোহরণ রূপে সজ্জিত হয়ে শীতের রাত্রিকে অন্য এক রূপ দেবে বলে প্রত্যাশা আছে। বলেছেন –
অন্ধকারের থেকে তোমার আলোর বাণী
ফুটবে কেবল আমি জানি।
নিজেকে সেই শীতের কোকিলের মতই একা ও সঙ্গীহীন মনে করেছেন। তার মত এই গীতিকারও বসন্তের প্রতীক্ষায় আছে।৬ সংখ্যক গানে এসেছে ‘খাম্বাজ’ রাগের কথা। এসেছে পথভোলা পথিক, দখিন গাঁ, পাতালপুর, পাগল, মজা নদীর কথা। গানের শেষটি রবীন্দ্র-গানের অনুষঙ্গকে মনে করিয়ে দেয় –
চুকিয়ে দেবে – ফিরবে দখিন গাঁ
পাগল তোমার পথ যে ভোলে না।
দুটি গানে আছে এক রাজার কথা। ৯ সংখ্যক গানের রাজা নিজ হাতে আমন ধান পোঁতে। সে নিঃসঙ্গ এবং উৎসবে যোগ দেওয়া তার বারন আছে। সকলে আপন কাজে ব্যস্ত থাকে। আর বনে ফুল ফোটে না, সময় এখানে শেষ হয়ে যায় দ্রুত। ১৭ সংখ্যক গানে এসেছে আরেক রাজার কথা। সে হৃদয়-মধুপুরে থাকে। সে দোষীর সব দোষ নিজ মাথায় নেয়। গানের নায়ক তার সখিকে সেই রাজ্যে নিয়ে যেতে চায়। সে তো বিদেশিনী এই শহরে। অন্য একটি গানে আছে জমিদারের কথা। ২৮ সংখ্যক গানে সেই জমিদারের কাছে একটুখানি জমি যাচ্ঞা করা হয়েছে। সেখানে নায়ক তাঁতের কল বসাবে, কাপাস গাছের চাষ হবে। জমিদারের বুকের মাঝেই আছে পরাণ তাঁতি। ভুবন-ডাঙা পেরিয়ে সেই মহলে সেই কৃষিক্ষেত্র গড়ে উঠবে।
১১ সংখ্যক গানে এসেছে ফাল্গুনের লাল পলাশের কথা। সেখানে ‘ভালোবাসার স্রোতে হৃদয় উঠেছে দুলে’। ‘তুমি’ নামক সর্বনামটি এখানে ফাল্গুনের দেশের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। ১৩ সংখ্যক গানে এসেছে বাগানের গোলাপের প্রসঙ্গ। সেই বাগানে রাত্রে লুটিয়ে পড়ে জ্যোৎস্না। প্রেমিকার উদ্দেশ্যে বলেছেন গীতিকার – ‘তুমি আর এসে বোসো না আমার পাশে’। বাগানের গোলাপ ও জ্যোৎস্নাই তার ভালোবাসা পাবার অধিকারী। ১৯ সংখ্যক গানে দেখা যায় যে ভ্রমর এসে বেড়ায় ফুলের বনে। সেখানে ‘সর্বনাশের ভাষা/ ও মন-নদীতে আজ হয়েছে জল অবাধ্য কূলনাশা’। হৃদয় সেখানে বিষণ্ণতায় লীন ছিলো। হঠাৎ সেখানে ‘ভূবনময়ী রাণী’ এসে বলেছে ‘চাইনা কিছু – বাঁচতে শুধুই যাই’। ২৭ সংখ্যক গান পদ্মফুলকে নিয়ে লেখা হয়েছে। গানের প্রথমাংশে বোঝা যায় পদ্ম যেন ছদ্মবেশে তার কাছে এসে বিরহের গান গাইছে। শেষে আমরা দেখি এই পদ্ম আসলে কোনো এক নারী। যেখানে গানের রেশ ফুরিয়ে গেলে নায়ক বলে – ‘আমার মধ্যে পাবি স্বামী/ তুই সে-পারমিতা/ পদ্ম আমার পদ্ম রে’। ৩১ সংখ্যক গানে প্রেমিকাকে বলেছে নায়ক – ‘তুমি আজ ফুলের মতো হও’। এক পরম রমণীয় জ্যোৎস্না-রাতে মনোগুহা থেকে বেরিয়ে এসে নিকটজনের কাছে দাঁড়াতে বলেছে সে। এখানে মধ্যম পুরুষকে ‘প্রিয়’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। ‘প্রিয় তুমি প্রচার করো মায়া/ প্রিয় তুমি ফুলের মতো হও’ –এই সম্বোধনে উত্তম পুরুষটি ঠিক কে সেটা নিয়ে আমরা হতচকিত হয়ে যাই। নায়কের মনোগুহার মধ্যে অবস্থিত কোনো এক পরম-পুরুষ কিনা আমাদের মনে ধন্দ লাগে। রবীন্দ্রনাথের গানে এই রকম ব্যবহার আছে। ৩৫ সংখ্যক গানে আছে — এক বাঁশি-বাজানো রাখাল ছেলের কথা। বলেছে – ‘রাখালছেলে, তুমি আবার বাজাও বাঁশি/ ঝলমলিয়ে উঠুক এ মন পরবাসী’। এই রাখাল ছেলে পুরাণের কৃষ্ণ নয়। কিন্তু সে সাধারণ গ্রাম্য রাখাল-ছেলে যে নয় সেটা বুঝতে পারি যখন এখানে বলা হয় – ‘তুমি কি তার দেখা পেলে/ তোমার দেশে?’ হতে পারে নিজের অন্তরস্থিত সত্তাকেই বলেছেন ‘রাখাল’ কিম্বা কোনো এক পরম পুরুষকেই সম্বোধন করে এই উচ্চারণ করেছেন।
৩০ সংখ্যক গানে এসেছে কল্‌মিলতার বন আর সকালের ঝরে যাওয়া রঙিন শেফালিফুলের কথা। এই গানেও এসেছে এক রাজপ্রাসাদের কথা। সেই রাজপ্রাসাদ থেকে অনেক দূরে অবস্থিত তাঁর নিজের ‘হৃদয়পুর’।
১৬ সংখ্যক গানে আছে শাল-মহুয়ার দেশের কথা। সেখানে পথে পথে ছড়িয়ে আছে কোনো এক ভালোবাসা। সেখানে যেন নায়ক উপলব্ধি করেছে যে তারা দুজনে দুজনের থেকে আস্তে আস্তে আরও অনেক দূরে চলে যাচ্ছে।
‘তুমি’ নামক সর্বনামটি এই ছত্রিশটি গানেই উপস্থিত আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ‘তুমি’ কোনো এক রক্ত-মাংসের মানবী। কিন্তু সে এখন বিচ্ছিন্ন। তাই সে সীমাবদ্ধ মানবীসত্তা থেকে উত্তীর্ণ হয়ে প্রকৃতি ও ভূমার মধ্যে বিস্তৃত হয়েছে। কখনো এই ‘তুমি’ নেহাৎ প্রকৃতি। কখনো সে নিজের অন্তরস্থিত অনির্বচনীয় সত্তা। ‘তুমি’ সম্বোধিত মানবী থেকে বিদায়ের পালা, স্মৃতি ও পুনর্মিলনের প্রত্যাশা আছে প্রায় সকল গানের মধ্যে। রক্ত-মাংসের অস্তিত্ব থেকে সে এখন কল্পলোকের বিহারিণী হয়ে অবস্থান করেছে স্থান ও কালের ঊর্ধ্বে উঠে।
গীতিকার বা গানের রচয়িতা হিসেবে শক্তি তেমন দক্ষতা প্রকাশ করতে পারেন নি। এই গানগুলি রচনার পরে আরও তিরিশ বছর বাংলা কবিতার জগতে সবিশেষ জনপ্রিয়তার সঙ্গে বিরাজ করেছেন তিনি। কিন্তু দ্বিতীয়বার আর গান রচনা করেন নি। ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে একটি মাত্র অসম্পূর্ণ গান রচনা করেছিলেন। কেন তিনি আর গান রচনা করেন নি সেটা আরও অনুসন্ধানের বিষয়। বিগত শতকের আশির দশকে যখন বাংলা গানের জগতে ‘জীবনমুখী’গানের প্রচলন ও বিস্তার হয় তখন সেগুলি তিনি শুনতেন ও পছন্দও করতেন। কিন্তু তিনি নিজে আর গান রচনা করেন নি। এর কারণ হিসেবে বলা যায় যে তিনি নিজে গান গাইতে জানতেন না। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল যেমন নিজে গান রচনা করে সুরারোপ করে গাইতে পারতেন তেমন তিনি পারেন নি। এটাও মনে হয় যে তাঁর আশেপাশে কেউই তাঁর রচিত এই গানগুলি সুরারোপ করে গায় নি বা গাইবার আগ্রহ প্রকাশ করে নি। এই ছত্রিশটি গানের মধ্যে অনুকরণ বা অনুসরণই বেশি। তবে কোথাও কোথাও যে কিছু কিছু নিজস্বতা গঠিত হয় নি তাও বলা যায় না। কোনো কোনো গানে ভাবনা ও অনুষঙ্গ রচনার ক্ষেত্রে কিছু নিজস্বতা দেখা যায়। তবে পরিপার্শ্বের উৎসাহ তেমন তিনি পান নি। তাই হয়তো পরবর্তীকালে আর তিনি কোনো গান রচনা করেন নি। তবে গান সকল সময়েই সুরের অপেক্ষা করে। সুরারোপ ছাড়া একটি গান কোনোভাবেই ভাবসঞ্চার ঘটাতে পারে না। তাই শক্তির এই গানগুলি সুরারোপ করে গাইলে তবেই এগুলির সফলতা বোঝা সম্ভব।
তাঁর রচিত এইসব গান নিয়ে তেমন কেউ উৎসাহ দেখান নি। হয়তো গানের জগতে এইসব গানের সন্ধান সুরকার ও গায়কেরা পান নি। কিন্তু তাঁর কবিতা নিয়ে সুরারোপ করে গান হিসেবে উপস্থাপনা হয়েছে বারবার। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর ‘একটি পরমাদ’ নামক বিখ্যাত কবিতাকে গানের আকারে পরিবেশন করেছিলেন গায়িকা কুমকুম চট্টোপাধ্যায়। গানটি সেইসময় বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। এর কিছুকাল পরে রীতা গঙ্গোপাধ্যায় নামক একজন গায়িকা তাঁর কয়েকটি কবিতা নিয়ে একটি গানের ‘ক্যাসেট’ করেছিলেন। সম্ভবত সেটি ছিলো গত শতকের আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। গায়ক অজিত পাণ্ডে তাঁর ‘অবনী বাড়ি আছো’ সহ আরও কয়েকটি কবিতা নিয়ে সুরারোপ করে গেয়েছিলেন। সেই গানগুলি তাঁর কবিতার মতই খুব জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলো। পরবর্তী কালে নব্বই-এর দশকে গায়িকা শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধায় তাঁর জনপ্রিয় পাঁচটি কবিতা নিয়ে গান হিসেবে পরিবেশন করেছিলেন। সেগুলি একসময় বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলো। সাম্প্রতিককালে লোপামুদ্রা মিত্র ‘অবনী বাড়ি আছো’ সহ আরো কয়েকটি কবিতা নিয়ে গান হিসেবে পরিবেশন করেছিলেন। কোনো কোনো গানে তিনি সংলাপ জুড়ে দিয়ে আলাদা একটা ব্যঞ্জনা তৈরির চেষ্টা করেছেন।
এই প্রক্রিয়া সম্বন্ধে বলা যায় যে তাঁর কবি হিসেবে যে জনপ্রিয়তা ছিলো সেই খ্যাতিকে কিছুটা ব্যবহার করে গীতিকার হিসেবে তাঁকে প্রতিষ্ঠা করবার প্রচেষ্টা করেছেন বিখ্যাত গায়ক-গায়িকারা। এই কবিতাগুলি আগে কবিতা হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। পরে এইগুলির গীতরূপ আলাদাভাবে শ্রোতার মনে ছাপ ফেলতে পেরেছে। উদাত্ত কন্ঠে আবৃত্তির মধ্যে একটি কবিতার যে ভাব ও রস-সঞ্চার-ক্ষমতা প্রকাশিত হয়, সুরারোপ করে তার মধ্যে ভিন্ন ধরনের এক রসানুভব নির্মাণের অপেক্ষা থাকে। গান হিসেবে লিখিত রচনাগুলি সুর ছাড়া পূর্ণ রসনিষ্পত্তি ঘটাতে পারে না। কিন্তু কবিতা আলাদাভাবে সফলতা পায়। আবার সেগুলি সুরারোপের মাধ্যমে আলাদাভাবে ভাব-পরিমণ্ডল নির্মাণ করে।

(‘শক্তির কবিতা কবিতার শক্তি’ নামে প্রাবন্ধিকের রচিত পুস্তক প্রকাশিত হতে চলেছে।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here