শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়:নিপীড়িত মানুষের মুখপাত্র

    0
    1157

    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়:নিপীড়িত মানুষের মুখপাত্র-
    হজরত উমার ফারুক,গবেষক।

    ‘রবি যখন মধ্য গগনে তখন চন্দ্রের উদয় বলা বাহুল্য সেই চন্দ্র,শরৎ চন্দ্র।রবিতাপে ঝলসে গেল না শরৎ চন্দ্রের স্বকীয়তা।'(দেবেশ কুমার আচার্য্য,বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস)রবীন্দ্র সমসাময়িক কালে অবস্থান করেও তিনি নিজস্বতা বজায় রাখতে সক্ষম ছিলেন।বাংলা সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে তিনি নতুন ধারার সৃষ্টি করেছিলেন।তথাকথিত আভিজাত্য বর্জন করে সহজ সরল জীবন কথা সাহিত্যে চিত্রিত করেন।যাঁদের হয়ে কলম ধরলেন তাঁরা নিম্নবর্গীয়,সমাজের উপরতলায় মানুষ তাঁরা নন।শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অকপটে সে কথা স্বীকারও করেছেন-“সংসারে যারা শুধু দিলে, পেলে না কিছুই, যারা বঞ্চিত,যারা দুর্বল,উৎপীড়িত,মানুষ হয়েও মানুষ যাদের চোখের জলের কখনও হিসাব নিলে না,নিরুপায় দুঃখময় জীবনে যারা কোনদিন ভেবেই পেলে না,সমস্ত থেকেও কেন তাদের কেন তাদের কিছু অধিকার নাই,……. এদের বেদনাই দিলে আমার মুখ খুলে,এরাই পাঠালে আমাকে মানুষের কাছে মানুষের নালিশ জানাতে।”তিনি যে সমাজের নিপীড়িত,নির্যাতিত,অসহায় মানুষদের মুখপাত্র তাতে কোন সংশয় নেই।এই জনদরদী প্রখ্যাত বাঙালি কথাসাহিত্যিক তার সাহিত্যকর্মের জন্যে পাঠকের হৃদয়পটে আজও ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী’ হিসেবে স্বমহিমায় বিরাজমান।

    ব্যক্তি পরিচয়:
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে ১৫ই সেপ্টেম্বর হুগলি জেলার দেবানন্দপুর  গ্রামে পরাধীন ভারতবর্ষের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন।তাঁর পিতার নাম মতিলাল চট্টোপাধ্যায় ও মাতার নাম ভুবনমোহিনী দেবী।দেবানন্দপুর গ্রামেই শরৎচন্দ্রের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয়।পরবর্তীতে দারিদ্রের কারণে ভাগলপুরে মামার বাড়ি চলে আসলে সেখানেই তার আবার পড়াশোনা শুরু হয়।তিনি ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে ভাগলপুর তেজনারায়ণ জুবিলি কলেজিয়েট স্কুল থেকে দ্বিতীয় বিভাগে এন্ট্রান্স পাশ করে এফএ ভর্তি হন। কিন্তু পরীক্ষার ফি দিতে না পারার জন্য এফএ পরীক্ষা দেওয়া হয়নি।তাঁর প্রথাগত লেখা পড়া এখানেই শেষ।এ প্রসঙ্গে তিনি নিজেই বলেন-“আমার শৈশব ও যৌবন ঘোর দারিদ্রের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে।অর্থের অভাবেই আমার শিক্ষালাভের সৌভাগ্য ঘটেনি।পিতার নিকট হতে অস্থির স্বভাব ও গভীর সাহিত্যানুরাগ ব্যতীত আমি উত্তরাধিকার সূত্রে আর কিছুই পাইনি।পিতৃদত্ত প্রথম গুণটি আমাকে ঘর ছাড়া করেছিল–আমি অল্পবয়সেই সারা ভারত ঘুরে এলাম।আর পিতার দ্বিতীয় গুণের ফলে জীবনভরে আমি কেবল স্বপ্ন দেখেই গেলাম।”তবে সাহিত্য,সংস্কৃতি ও সংগীতে ছিল তাঁর প্রবল আকর্ষণ।

    কর্মজীবন:
    শরৎচন্দ্রের ভাগলপুর শহরের সঙ্গে ছিল এক নিবিড় যোগ।বাল্য,কৈশোর,প্রথম যৌবন ও সাহিত্য চর্চা এই ভাগলপুর শহরকে কেন্দ্র করেই।তিনি শহরের আদমপুর ক্লাবে নিয়মিত যেতেন।সেখানে ক্লাব সদস্যদের সঙ্গে সাহিত্য চর্চা খেলাধুলো ও অভিনয় করে সময় কাটাতেন।জীবন-জীবিকার তাগিদে তিনি ভারতবর্ষের নানাপ্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন।কখনো তিনি ব্রহ্মদেশ কখনো বা রেঙ্গুনে বাস করেছেন।তিনি রেঙ্গুনে প্রায় দশ-বারো বছর করণীকের চাকরি করেন।

    শরৎচন্দ্রের ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘মন্দির’ গল্প টি প্রথম মুদ্রিত রচনা।এই গল্পটিই ‘কুন্তলীন’ পুরস্কার লাভ করে।যদিও তিনি গল্পটি সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের নামে লিখেন।ভারতী পত্রিকার বৈশাখ-আষাঢ় সংখ্যায় ‘বড়দিদি’ রচনাটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পাঠক সমাজে তিনি জনপ্রিয়তা লাভ করেন।

    শরৎচন্দ্র ছিলেন মূলত ঔপন্যাসিক তবে ছোটগল্প,প্রবন্ধ ও লিখেছেন।তিনি সমাজের অবহেলিত শ্রেণির দুঃখ দুর্দশাকে শিল্পরূপ দেন।তাঁর অধিকাংশ উপন্যাস ও গল্পেই সমাজ-সমস্যা নিয়ে রচিত।তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার দলিল হিসেবে তাঁর’পল্লীসমাজ’ উপন্যাস একটি কালজয়ী রচনা।এখানে সামাজিক রীতিনীতি,আচার অনুষ্ঠানের নামে সমাজপতিদের শোষণ,অনাচার ও ভণ্ডামি কে নিপুনভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।সেই সঙ্গে নিপীড়িত মানুষদের মুখপাত্র হিসেবে রমেশের মতো আধুনিক শিক্ষিত যুবক কে সমাজপতি জমিদারদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছেন।সমালোচক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এই উপন্যাস সম্পর্কে বলেন-“এই উপন্যাস কোন একটি বিশেষ সামাজিক কুপ্রথার প্রতি কটাক্ষপাত হয় নাই,কিন্তু হিন্দু সমাজের প্রকৃত আদর্শ ও মনোভাবের,ইহার সমগ্র জীবনযাত্রার একটা নিখুঁত প্রতিকৃতি দেওয়া হইয়াছে।…..আমরা আমাদের সামাজিক বিধিব্যবস্থাগুলির সনাতনত্বের ও উৎকর্ষের বড়াই করি;শরৎচন্দ্র নির্মম বিশ্লেষণের দ্বারা দেখাইয়াছেন যে,আমাদের গর্বের এই প্রথাগুলি প্রকৃতপক্ষে আমাদিগকে কোন সর্বনাশের রসাতলে লইয়া গিয়েছে!”
    ‘পল্লীসমাজ’ ছাড়াও ‘পণ্ডিতমশাই’ ‘অরক্ষণীয়া’,’বামুনের মেয়ে’ প্রভৃতি উপন্যাসে সামাজিক অনাচার,অত্যাচার ও উৎপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে।
    শরৎচন্দ্রের সমাজসচেতনতা ও নিপীড়িত মানুষের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ পেয়েছে এমন গল্প গুলির মধ্যে অন্যতম হল ‘অভাগীর স্বর্গ’ ও ‘মহেশ’ গল্প দুটি।গল্প দুটিতেই সমাজের উচ্চবর্গ ও নিম্নবর্গীয় মানুষের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।
    ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পে নিম্নবর্গীয় বাউড়ি র মেয়ে কাঙালির মা কামনা করে জমিদার গৃহিণীর মতো যেন তার মহা সমারোহে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।কিন্তু দারিদ্র্য ও সমাজের জমিদারি ব্যবস্থার অমানবিক রীতিনীতির কারণে কাঙালি তার মায়ের সেই ইচ্ছাপূরণ করতে পারেনি।শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পে দরিদ্র মুসলিম চাষি গফুরের তার গৃহপালিত গরু মহেশের প্রতি বাৎসল্য সুলভ ভালোবাসা ও ব্রাহ্মণদের মেকি গোজাতি-প্রীতি দেখানো হয়েছে।গফুর মহেশকে খড় দিতে পারে না তাই নিজে ভাত না খেয়ে মহেশকে দেয়।আর ব্রাহ্মণ তর্করত্ন মহাশয় মহেশের জন্য গফুরকে সামান্য কিছু খড় ধার না দিয়ে শুধুমাত্র মুখে মহেশের প্রতি প্রীতি প্রকাশ করে।এপ্রসঙ্গে শ্রী কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় যথার্থই বলেছেন-“হিন্দুর গোজাতি-বাৎসল্য ও মুসলমানের গোখাদক-বৃত্তি সম্বন্ধে আমাদের যে বদ্ধমূল ধারণা আছে শরৎচন্দ্র তাহারই বিরুদ্ধে প্রচারের আতিশয্যহীন,কলাবোধসম্মত একটি অতি-সূক্ষ্ম প্রতিবাদ জানাইয়াছেন।তর্করত্নের শাস্ত্রবিধি সমর্থিত গোপ্রশস্তি যে নিছক ভণ্ডামি ও গফুরের অযত্ন যে নিরুপায়ের গভীর বেদনাময় অক্ষমতার ফল তাহা বুঝিতে আমাদের এক মুহূর্তও দেরি হয় না”।(বঙ্গ সাহিত্যে উপন্যাসের ধারা,পৃষ্ঠা-২২৭)

    মহেশ-কাল্পনিক চিত্র।

    প্রকৃতপক্ষে শরৎচন্দ্র প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি,কুসংস্কার,ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও অশিক্ষার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন।তিনি ছিলেন প্রকৃত সত্য ও সুন্দরের উপাসক।সমাজে নারীরা বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছেন,তাদের চাওয়া পাওয়া পুরুষের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে।পুরুষ শাসিত সমাজে তারা অত্যাচারিত,নির্যাতিত,নিপীড়িত তাদের হয়ে জোরাল সওয়াল করেছেন শরৎচন্দ্র।তিনি নারী হৃদয়ের প্রণয়াকাঙক্ষাকে যেমন রূপ দিয়েছেন তেমনি তার সঙ্গে নারী হৃদয়ের বাৎসল্য এর রূপ ও চিত্রিত করেছেন।’চরিতহীন’ উপন্যাসের সাবিত্রী,’শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের অন্নদা দিদি প্রমুখ সমাজের উপেক্ষিত নারী তাঁর উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র।এ প্রসঙ্গে ড.পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন-“বাংলার পল্লীসমাজের সংকীর্ণ প্রথাপোষিত জীবনযাত্রার অন্তরালে নির্বাসিত প্রেম কিভাবে গুমরে মরে,সংস্কার ও সতীত্বের দুমুখো অস্ত্রের আঘাতে এই সমাজে কিভাবে নারীমন হত্যা করা হয়,ন্যায়-বিধানের নামে মানুষকে স্বর্গে পাঠানোর চিন্তায় উচ্চবর্ণের সমাজপতিরা যে কি প্রবল অত্যাচার করে,শরৎ সাহিত্য তার জীবন্ত দলিল।শরৎ সাহিত্য প্রধানত নারী-মনের ভাষ্য, এ সত্য বহুজন স্বীকৃত।নারীর মূল্য,শরীর নারীত্ব ও সামাজিক মর্যদা তাঁর গল্প উপন্যাসে সর্বাধিক পরিমাণে প্রতিফলিত।”(বাংলা সাহিত্য পরিচয়,পৃষ্ঠা-৫৩০)
    শরৎচন্দ্র মানবচরিত্রের নিপুন বিশ্লেষণে ছিলেন অসাধারণ দক্ষ।রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেছেন-“শরৎচন্দ্রের দৃষ্টি ডুব দিয়েছে বাঙালির হৃদয় রহস্যে।সুখে দুঃখে মিলনে বিচ্ছেদে সংঘঠিত বিচিত্র সৃষ্টির তিনি এমন করে পরিচয় দিয়েছেন বাঙালি যাতে আপনাকে প্রত্যক্ষ জানতে পেরেছে”।সমাজের সাধারণ নরনারীর জীবনের ছবি প্রকাশিত শরৎ সাহিত্যে।তিনি সামাজিক সমস্যা গুলি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।শরৎচন্দ্র সমাজের নির্যাতিত,নিপীড়িত,অসহায়,অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের মুখপাত্র হিসেবে আজীবন কাজ করে গেছেন।
    জীবন সায়াহ্নে শরৎচন্দ্র:
    শরৎচন্দ্রের শেষ জীবন রোগভোগ ও নানা সমস্যার মধ্যে অতিবাহিত হয়েছে।১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ১৬ জানুয়ারি সকাল দশটায় জননন্দিত কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র ইহলোক ত্যাগ করে পরলোকে পাড়ি জমান।

    লেখক-হজরত উমার ফারুক,গবেষক।

    গ্রন্থ সূত্রঃ
    ১.আচার্য্য দেবেশ কুমার-বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস(আধুনিক যুগ)
    ২.চট্টোপাধ্যায় পার্থ-বাংলা সাহিত্য পরিচয়
    ৩.বন্দ্যোপাধ্যায় শ্রী কুমার-বঙ্গ সাহিত্যে উপন্যাসের ধারা
    ৪.সংসদ বাঙালি চরিতাবিধান(১ম খন্ড)
    ৫..সংসদ বাংলা সাহিত্য সঙ্গী

    নিউজফ্রন্ট এর ফেসবুক পেজে লাইক দিতে এখানে ক্লিক করুন
    WhatsApp এ নিউজ পেতে জয়েন করুন আমাদের WhatsApp গ্রুপে
    আপনার মতামত বা নিউজ পাঠান এই নম্বরে : +91-9593666485