রবিবারের গল্পঃ অন্য রবীন্দ্রজয়ন্তী

0
36

সৌমনা সেনগুপ্ত

আজ আবার ওই দিনটা। সকাল থেকে সব মেয়েরা লাল, বাসন্তী, নানা রঙের শাড়ি পরে, মাথায় হাতে ফুল লাগিয়ে, ছেলেরা পাঞ্জাবি পরে গান গাইবে, নাচ করবে আর ওই কি ঠাকুর যেন তার ছবিটাকে ফুল দিয়ে, চন্দন দিয়ে সাজাবে। ভারী ভালো লাগে এই দিনটা মুন্নির।

Rabindranath Tagore | newsfront.co

কী সুন্দর গান হয়, নাচ হয়, ছড়া হয় খুব ভাল লাগে সব। আর যার জন্য এত কিছু সেই এক মুখ সাদা দাড়িওয়ালা লোকটা কেও খুব ভালো লাগে। ছি ছি লোক কেন হবে ও তো ঠাকুর। কি যেন ঠাকুর, হ্যাঁ মনে পড়েছে রবি ঠাকুর।

ওর মুখটা দেখলে এক শান্তি নেমে আসে মনে, সব দুঃখের কথা বলতে ইচ্ছা করে, কেন কে জানে যখনই কোনও মুশকিলে পড়ে তখন শিব, দুর্গা নয় এই লোকটার মুখ ভেসে ওঠে, উফফফ, আবার লোক! নিজেকে একটু ধমকে নেয় মুন্নি। আরে ও তো ঠাকুর, মনে মনে মাফ চেয়ে নেয় আর ‘লোক’ বলবে না।

Soumana Sengupta | newsfront.co
সৌমনা সেনগুপ্ত

মুন্নির খুব ইচ্ছা করে ওই ইস্কুলে পড়া দাদা-দিদিদের মতো নাচ গান করতে, ঠাকুরের জন্মদিন পালন করতে কিন্তু সে গুড়ে বালি… কে দিচ্ছে ওর মতো মা বাপহীন, ভিখারি মেয়েকে এইসব করতে? গতবছর গিয়েছিল না ওই পাড়ার কেলাবটাতে? কীভাবে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল সবাই! ওর নোংরা ছেড়া জামা, মাথায় উকুন, জটা চুল, দেখে কেমন ঘেন্না পাচ্ছিল।

একজন তো বলেই দিল ও নাকি চুরি করতে এসেছে। খুব খারাপ লেগেছিল মেয়েটার। ও তো গেছিল ঠাকুরকে নম করতে আর গান শুনতে কিন্তু ওরা কেমন করল খুব বাজে ওরা, হ্যাঁ ওর মাথায় উকুন, জামা ছেঁড়া তো কী করবে ওর তো কেউ নেই, আজ যদি মা বাপ থাকতো তাহলে কি আর, এক লম্বা শ্বাস ফেলে মুন্নি।

গ্রামে যেবার বন্যা হলো তাতেই সব মরে গেল ওর আপনজন। ও ঘুরে ঘুরে চলে এল এই মহানগরে। সেই থেকে ভিক্ষা করে, এর ওর বাগান পরিস্কার করে দিন চলে। কারো ফেলে দেওয়া জামা কুড়িয়ে পরে নেয়, আবার অনেকে পুরনো জামাও দেয়। এইভাবেই চলে ওর।

আরও পড়ুনঃ দ্বিতীয় পর্বঃ ইতিহাসের অন্ধকার থেকে আলোর পথে শবর গোষ্ঠী

মালতী মাসি ওকে নিজের বাড়িতে থাকতে দেয়, তবে বিনা পয়সায় নয়, যা ভিক্ষা পায় তার থেকে রোজ ২০ টাকা করে নেয়, আর ঘরের সব কাজ করায়। মাসির কেউ নেই। ওই ওর মতো কয়েকটা অনাথ ভিখারীকে পয়সা নিয়ে থাকতে দেয়।

এই দুনিয়ায় বিনাপয়সায় যে কিছু হয়না তা এই বয়সে বুঝে গেছে মুন্নি। না আর এইসব ভাবলে হবে না, ধান্দায় যেতে হবে। কিন্তু কিছুতেই মন চাইছে না, বারবার চোখের সামনে ঠাকুরের মুখটা ভাসছে, আর ওই ইচ্ছাটাও মাথা চাড়া দিচ্ছে। ইস, ও যদি পারত ঠাকুরের জন্মদিন করতে! না সে আর হবার নয়।

আরও পড়ুনঃ রবিবারের গল্পঃ পরিবর্তন

আজ ভালই পয়সা পাচ্ছিল মুন্নি। কিন্তু মরণদশা বৃষ্টি এসে সব নষ্ট করে দিল। দুপুরে বাস ডিপোর কাছে একটা হোটেলে বাসন ধুয়ে দিয়ে দুমুঠো ডাল ভাত খেতে পায় ও। আজ খেয়ে আবার ভিক্ষায় বেড়িয়ে ছিল। সেই সময় এল বৃষ্টিটা। মাথা বাঁচাতে একটা বড় পাইপের ভেতর ঢুকে পড়েছিল, ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা হাওয়ায় কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে মনে নেই। আর তখনই সে দেখল এক অদ্ভুত স্বপ্ন।

চারিদিকে সাদা মেঘ ঘুরে বেড়াছে, নানা রঙের ফুল ফুটে আছে, কি সুন্দর তাদের গন্ধ! কত পাখি ডেকে চলেছে, আর দুধ সাদা একটা ফ্রক পরে নেচে বেড়াছে মুন্নি ওই “মেঘের কোলে” গানটাতে। হঠাৎ ওখানে এসে দাঁড়ালো ওই ঠাকুর। সাদা রঙের জোব্বা পরা, মুখে কি সুন্দর হাসি, অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মুন্নি।

আরও পড়ুনঃ রবিবারের গল্পঃ শীতকাতুরে

ঠাকুর মুন্নির দিকে হাত বাড়িয়ে বলেন “কি রে আমার জন্মদিনের উপহার দিবি না আমাকে?” ব্যাস ঘুম টা ভেঙে গেল এখানেই। ঘুম ভাঙতেই দেখে চারিদিক অন্ধকার হয়ে আছে, কত সময় পার হয়ে গেছে কে জানে, কিন্তু ও এমন স্বপ্ন দেখলো কেন, আর ঠাকুর ওর থেকে উপহার চেয়েছে কী দেবে ও? সেই থেকে ভেবে চলেছে, মালতী মাসির ডেরায় এসে খুব ঝাড় খেয়েছে আজ, আর রাতে খাবার জোটেনি, সে নিয়ে অবশ্য মোটেই মাথা ব্যথা নেই মুন্নির। মুন্নি খালি ভাবছে ঠাকুরকে কী দেবে। দাওয়ায় বসে ভাবতে ভাবতে কিছু একটা খুঁজে পেয়েছে এই ভাব করে উঠে দাঁড়ায়।

তারপর একবার ঘরে আর একবার মোড়ের রাধাচুড়ার গাছটা হয়ে ক্লাবের দিকে হাঁটা লাগায়। ক্লাবঘর তালা দেওয়া কিন্তু ওর উঠানে একটা চেয়ারের ওপর ঠাকুরের ছবিটা রয়েছে আস্তে আস্তে ওই ছবিটার দিকে এগিয়ে যায় মুন্নি, তারপর এক মুঠো রাধাচুড়া ফুল আর বিকেলে খাবে বলে একটা পাঁচ টাকার কেক কিনেছিল সেটাই ছবির সামনে রাখে আর হাত জোড় করে মনে মনে বলে- “এটা খেয়ে নিও ঠাকুর। আর ফুল টা মালা করে পরো।”

এই বলে একবার আকাশের দিকে তাকায়, ও শুনেছে ওই আকাশে ঠাকুরেরা থাকে। হঠাৎ ও দেখতে পায় ঠাকুর গলায় ওর ওই রাধাচুড়া ফুলের মালা পরে, হাসি মুখে কেক খাচ্ছে, ভীষণ আনন্দ হয় মুন্নির , আজ ওর ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে, ওর ঠাকুর ওকে ফিরিয়ে দেয়নি। ওর হাতের ফুল, খাবার নিয়েছে, খুশিতে নাচতে নাচতে বাড়ির দিকে যেতে থাকে মুন্নি। আর ওর ঠাকুর মুখে প্রশান্তি নিয়ে তাকিয়ে থাকে ভক্তের দিকে।

নিউজফ্রন্ট এর ফেসবুক পেজে লাইক দিতে এখানে ক্লিক করুন
WhatsApp এ নিউজ পেতে জয়েন করুন আমাদের WhatsApp গ্রুপে
আপনার মতামত বা নিউজ পাঠান এই নম্বরে : +91-9593666485