টাইগার জিন্দা হ্যায় : টাইগার যদি এইভাবে বেঁচে থাকতো!

0
150

টাইগার জিন্দা হ্যায় : টাইগার যদি
এইভাবে বেঁচে থাকতো!

(সমস্ত ছবি-সংগৃহীত) টাইগার জিন্দা হ্যায়

⭐⭐⭐⭐
৭/১০

পরিচালক : আলি আব্বাস জাফর

অভিনয় : সলমান খান, ক্যাটরিনা কাইফ, সাজ্জাদ দেলফ্রুজ, গিরিশ করনাড, পরেশ রাওয়াল, অনঙ্গ বেদি, কুমুদ মিশ্র।

২০০৪ সালে ইরাকের টিরকিট শহরে ৪৬ জন ভারতীয় নার্সকে ইসলামিক স্টেট অব ইরাক লেভান্ট (ISIL) অপহরণ করে। পরে তাদের মুক্ত করে দেওয়া হয় যখন তারা জানতে পারে নার্স হিসেবে তারা ভালো পরিষেবা দিয়েছে। এই সত্য কাহিনি অবলম্বনে মালয়ালম ভাষায় টেকঅফ নামে একটি ছবি হয় এই বছরেই। পরিচালক মহেশ নারায়ণ। পরিচালক আলি আাব্বাস একই সত্য ঘটনা নিয়ে তার এক থা টাইগার ছবির সিক্যুয়েল বানালেন টাইগার জিন্দা হ্যায়। ২২ ডিসেম্বর যে ছবিটি রিলিজ করেছে।

গোটা বিশ্বজুড়ে বিশেষত পশ্চিম এশিয়ায় সন্ত্রাসবাদী বর্বরতার ছবি তুলে ধরা ও তার বিরুদ্ধে কৌশলী লড়াই এই ছবির মূল বার্তা। কারণ পৃথিবীতে ভালো ও মন্দ এবং আলো ও অন্ধকারের লড়াই চলবে। আর এই লড়াইতে পরিত্রায়ণ সাধুনাম বিনাশয় চ দুষ্কৃতম এর মতো পরিত্রাতার ভূমিকায় আবির্ভূত টাইগাররূপী সলমান খান। আর এখান থেকেই বিনোদনের জয়যাত্রা শুরু। বাস্তবতা আর ফ্যান্টাসি হাত ধরে চললেও বাস্তবকে বন্দি রেখে ফ্যান্টাসি এখানে মুক্ত বিহঙ্গ!
২৫ জন ভারতীয় নার্স ইরাকের মুসুলে অপহৃত হয়। গোটা ইরাক তখন সন্ত্রাসবাদীদের দখলে। ভারতীয় এ্যামবাসি মারফত খবর আসে ভারতের মন্ত্রণালয়ে সকলেই নড়ে চড়ে বসে এই ঘটনায়। প্রতিরক্ষা দপ্তরের কূটনীতিজ্ঞ সেনয় ( গিরিশ) এই চরম বিপদ থেকে পরিত্রাণের জন্য রয়ের এজেন্ট টাইগারের নাম বলে। কিন্তু টাইগার কি জীবিত? আট বছর তার কোনো খোঁজ নেই। কিন্তু সেনয় ও দর্শক সকলকে স্বস্তি দিয়ে খোঁজ মেলে টাইগারের। টাইগার জিন্দা হ্যায়।
জোয়া আর ছেলেকে নিয়ে টাইগার এখন ঘোর সংসারী। পাকিস্তানি আই এস আই এজেন্ট জোয়া (ক্যাটরিনা) তার যোগ্য স্ত্রী । জোয়া তাকে দেশাত্মবোধে উজ্জীবিত করলে টাইগার রাজি হয় এই অভিযানের দায়িত্ব নিতে। শুরু হয় এক ভয়াবহ যাত্রা।
এই মিশনের সূত্রে আই এস আই এল -এর বর্বরতা ও ধ্বংসাত্মক ভয়ঙ্কর ছবিটি দর্শক দেখতে পায়। বিদেশিদের মুন্ডচ্ছেদ, ধর্ষণ, সন্ত্রাসে ব্যবহার, তেল শোধনাগারে শোষণ, তেল নিয়ে বিশ্ব রাজনীতি, ধর্মের নামে উগ্র মৌলবাদ তৈরি, নারীদের উপর পাশবিক অত্যাচার সবই এই ছবিতে আখ্যানের মধ্য দিয়ে দেখানো হয়। সন্ত্রাসবাদ আসলে বিশ্ববাজারকে মদত দেয়। এখানে তাই বিপুল বিনিয়োগ আর আধুনিক অস্ত্রের কেনাবেচা। সে কথা উচ্চকণ্ঠে বলে ছবিতে দেখানো আই সি এস নেতা হুসেন।
তেল শোধনাগারে কাজের সূত্রে টাইগার ও তার সহযোগী বন্ধুরা সরাসরি মিশনের কাজে যুক্ত হয়। তাদের কেউ প্রযুক্তি বিশারদ, কেউ বোম ডিসপোসালে পারদর্শী। আর সবার উপরে টাইগার ওরফে অবিনাশ সিং রাঠোর (সলমান)যার কাজ সরাসরি অ্যাকসনে শত্রুকে নিধন করা। সবরকম অাধুনিক অস্ত্র চালাতে সে দক্ষ। ফ্যান্টাসির হিরোরা যেমন হয় আরকি! এই মিশনে তারা পায় ফিরদৌস(পরেশ)কে।সেও একজন এজেন্ট হিসেবে দীর্ঘদিন পশ্চিম এশিয়ার ইরাকের শহরগুলিতে কাজ করে। কাহিনির অগ্রগতিতে আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে এক ভারতীয় সদস্যকে রক্ষা করে মাঠে নেমে পড়ে জোয়া।কারণ পাকিস্তানের ১৫জন নার্সকেও সন্ত্রাসিরা অপহরণ করেছে। ভারতের র আর পাকিস্তানের আইএসআই যৌথ অভিযান শুরু হয়। ভাবনটিও ফ্যান্টাসির সঙ্গে বেশ মানিয়েছে। দুই দেশের পতাকার সমাবেশে দর্শকও কিছুটা মানসিক রিলিফ পেয়েছে।
নার্সদের অপহরণের কারণ ছবির শুরুতে দেখিয়েছেন পরিচালক। বিশ্ব সন্ত্রাসের ত্রাস আই এস সি নেতা আবু ওসমান আহত। তাকে সুস্থ করে তুলতে নার্সদের অপহরণ। হাসপাতাল হয়ে ওঠে জঙ্গিদের ঘাঁটি। মানবাধিকার লঙ্ঘন করে আমেরিকা সহজে সেখানে আক্রমণ করতেও পারবেনা। এই কৌশলও তারা নিয়েছে। আর নির্ধারিত চারদিনের মধ্যে নার্সদের উদ্ধার করতে হবে নইলে আমেরিকা এয়ার স্ট্রাইক করবে। সময় ক্রমশই কমে আসে। নানা বাধা বিপত্তি, নানা কৌশল, অজস্র অস্ত্রক্ষরণ, এক সঙ্গীর মৃত্যু, এক নার্সের হত্যা, উদ্যত মৃত্যু, শীতল ভয়াল সন্ত্রাসের পাল্টা আঘাত, প্রচুর হত্যা প্রভৃতির মধ্যে মারাত্মক হয় আহত টাইগার। মরণাপন্ন আবু ওসমান। তাকে বাঁচিয়ে সামনে রেখে ফিরদৌসের সহায়তায় মুক্ত হয় দুই দেশের নার্স। কিন্তু তারই ভিতর আবু ওসমানের ক্ষিপ্র কৌশলে ধরা পড়ে যায় জোয়া। তাকে অন্ধ কূপে বন্দিনী করে আগেই রেখে দেয় আবু। হাতে সময় আর কয়েক সেকেন্ড। টাইগারের মুখে পরাভব চিহ্ন। সে কি পারবে স্ত্রী জোয়াকে উদ্ধার করতে? টাইগার কি বেঁচে থাকবে? সলমান ভক্তদের উদ্বেগের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় এয়ার স্ট্রাইক। পর্দাজুড়ে বিস্ফোরণের লেলিহান শিখা। আবু ওসমানের শরীরে শেষ পেরেকটি পুঁতে ফিরদৌস তিরকিতে আবার মানুষের ভিড়ে। বর্ডারে তখন ঘরে ফেরার আনন্দ। দুই দেশের পতাকার এক সঙ্গে ওড়ার সীমাহীন আনন্দ। ভারতের মণ্ত্রণালয়ে সেনয় ও অন্য অফিসারের চোখে মুখে বিজয়ের হাসি। কিন্তু টাইগার! টাইগার কোথায় কি হলো তার? জোয়া কি হারিয়ে গেল আগুনের লেলিহান শিখায়? কি হলো তাদের পরিণতি? এটা জানতে ছবিটি হলে দেখতে হবে।
ছবিটিতে সলমান অভিনয় করেছেন তার ভক্ত দর্শকদের চাহিদা মতো। ফ্যান্টাসির হিরোদের কাছে দর্শক যেমন চান আর কি! সমস্তটা পূরণ করেছেন তিনি। অভিনয়ে, অ্যাকসনে, চলনে বলনে তিনি বিনোদনের ভরপুর প্যাকেজ। দক্ষিণের থালাইভা রজনীকান্তের মতো। যুক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে নয়, তার ছবি আবেগ দিয়ে বোঝে দর্শক। জীবনের থেকে বড় তার চরিত্রে সলমন একাই একশো। সুপারম্যান সত্তা নিয়ে সে সব সংকট দূর করে সব সমস্যার সমাধান করবে এটাই তাদের কাম্য। এই কাজটি পারদর্শিতার সঙ্গে করেছেন ৫৩ ছোঁয়া সলমন।
জোয়া চরিত্রে কিছুটা দাগ কেটেছেন ক্যাটরিনা।সলমনের ছবিতে নায়িকার কিছু তেমন করার থাকেনা। কিন্তু ক্যাট গ্ল্যামারকে ভেঙে ও অ্যাকসনে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়ে প্রয়োজনীয় কাজটুকু করেছেন।
আবু ওসমান চরিত্রে ইরানী অভিনেতা সাজ্জাদ দেলফ্রুজ অসম্ভব ভালো ও পরিমিত অভিনয় করেছেন। শান্ত ও ভয়াল দুটো রূপকেই তিনি মেলাতে পেরেছেন। ওসামা বিন লাদেনের ব্যক্তিত্বও কিছুটা অনুসরণ করেছেন। কথা বলার স্টাইলটিও সন্ত্রাসী নেতার মতই আগ্রাসী ও বিনয়ী।
অন্যন্য চরিত্রের মধ্যে শেনয় চরিত্রে গিরিশ করনড যথাযথ। অনেকদিন পর বড় পর্দায় তাকে দেখে ভালোলাগলো। ফিরদৌস চরিত্রে ম্যানারিজম ও বিশেষ চলনভঙ্গি সহ পরেশ রাওয়াল তার অভিনয় ক্ষমতার পরিচয় রেখেছেন। পার্শ্ব চরিত্রে অঙ্গদ বেদি, কুমুদ যোশি ভালো অভিনয় করেছেন। বিশেষত উল্লেখ্য যোশী। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের একজন সদস্য পওন চরিত্রে নবাব শা একেবারেই বেমানান। আই সি এস দলের শিশুটির চরিত্রটিও খুবই জীবন্ত অভিনয়ে প্রাঞ্জল।
টাইগার জিন্দা হ্যায় অ্যাকসনধর্মী থ্রিলার। সংগীত এখানে খুব গুরুত্ব পায়নি। বিশাল-শেখর সুরারোপিত আতিফ আসলমের গাওয়া দিল দিয়া গলন, বিশাল দাদলানির গাওয়া সগ সে স্বাগত, সুখবিন্দর সিং-এর জিন্দা হ্যায় গানগুলি শুনতে ভালোই লাগবে। ছবির শেষে বিশালের গান টাইগারের বেঁচে থাকার ইঙ্গিতবাহী।
তবে ছবির ব্যাক গ্রাউন্ড স্কোরের কাজটি সুচারু ও ছবির মেজাজ অনুযায়ী করেছেন তারা।
ছবিটির বড় সম্পদ এর ক্যামেরার কাজ। কাজটিতে অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন মারসিন লাসকাউইস। সন্ত্রাসের শীতল আবহ নির্মাণে তার ক্যামেরা অনন্য। বোমবিধ্বস্ত ইরাকের মুসুল ও তিরকিত শহর তার ক্যামেরায় জীবন্ত। স্পেশাল এফেক্ট ও অ্যাকসনের পাশে দীক্ষিত দর্শক তার কাজ মনে রাখবে। গ্রীস, মোরাকো, ইরাক, সুইজারল্যান্ড প্রভৃতি নানা ভৌগলিক অঞ্চলে ছবিটির শ্যুটিং হয়ছে আর মারসিনের ক্যামেরায় দর্শক মোদিত হয়েছে।
এডিটিং ছবিটিকে গতি দিয়েছে। রামেশ্বর ভগত শৈল্পিক ভাবনায় ছবির গতিকে উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছেন।
যশরাজ ফিল্মের ব্যানারে আদিত্য চোপড়া প্রযোজিত ছবি টাইগার জিন্দা হ্যায়। বিনোদনের সমস্ত মশলা এতে উপস্থিত। ভালো-মন্দ, দেশভক্তি, ভারত-পাকিস্তান, বিশ্বজোড়া সন্ত্রাসবাদ, অ্যাকসন, ভালো লোকেসন।যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে এ ছবি বোঝা যাবে না। বিনোদনে ভরপুর ককটেলই তো চাই সলমান বা এই ধরনের ছবির দর্শক। পরিচালক তা পূর্ণ করেছেন। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মিশন ও এজেন্ট নিয়োগ নিয়ে গোবিন্দ নিহালনি বহুদিন আগে দ্রোহকাল নামে একটি ছবি করেছিলেন, আফগানিস্তানের এক পরিচালক বানিয়েছিলেন ওসামা নামে একটি ছবি। তালিবানি বর্বরতা ও সন্ত্রাস তার প্রধান বিষয় বাস্তবতার পটভূমিতে। কিন্তু আলি আব্বাস সে সবের ধারে কাছে যাননি। তার ছবি দর্শকের ইচ্ছাপূরণের ছবি। সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে টাইগার যেভাবে একতরফা লড়াই করে জিতেছে তাতে দর্শকের মন আহ্লাদিত। কিন্তু বাস্তব অবস্থা কি তাই বলে? সে পথ কঠিন কঠোর মৃত্যুর ভয়ংকর পথ। তাই টাইগাররা যদি এই ভাবে ফ্যান্টাসির আখ্যানের মতো শুধু পশ্চিম এশিয়া নয় বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাস দমন করতে থাকে তবে তো সুন্দর দিন আগত! তবেই তো বোঝা যাবে টাইগার জিন্দা হ্যায়। কিন্তু বাস্তব পরিসংখ্যান তা বলছে না।
টাইগার জিন্দা হ্যায় প্রকৃতই বিনোদন রঞ্জিত বাণিজ্যিক ছবি। ১৫০ কোটি টাকা বাজেটর এই ছবি ইতিমধ্যেই ১০০ কোটি টাকার ব্যবসা করেছে। সেই দিক থেকে ছবিটি সফল।

টিকিট না পেয়ে রিভিউ লেখার জন্য ছবিটি যখন মফস্বলের সাধারণ হলে দেখছি তখন গোটা হল একটা কার্ণিভালে মেতে উঠেছে। তার নাম সলমান খান। ঘন ঘন সিটি আর হাততালি আশির দশকে সিনেমার সেইসব দিনগুলি ফিরিয়ে দিচ্ছিল। আমার বন্ধুর পাশে বসা এক তরুণ বলছে : যতক্ষণ অ্যাকসন চলবে ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবো!
ঠিক তখনই বুঝলাম এদের ভিতরে টাইগার নয় বেঁচে আছে সলমন আর বাস্তববিমুখ বিনোদন আর ভাবনাহীন বাস্তব।
শুভেচ্ছা সলমন,
তুমি আজ ৫৩!

ড.মানবেন্দ্রনাথ সাহা,অধ্যাপক বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়

ফিল্ম রিভিউ : ড. মানবেন্দ্রনাথ সাহা

নিউজফ্রন্ট এর ফেসবুক পেজে লাইক দিতে এখানে ক্লিক করুন
WhatsApp এ নিউজ পেতে জয়েন করুন আমাদের WhatsApp গ্রুপে
আপনার মতামত বা নিউজ পাঠান এই নম্বরে : +91 94745 60584

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here